সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার খাসিয়ামারা নদীর ওপর নির্মাণাধীন একটি সেতু ঘিরে স্থানীয় মানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার এখনও অবসান হয়নি। প্রায় পাঁচ বছর আগে শুরু হওয়া নির্মাণকাজ শেষ না হওয়ায় প্রতিদিন শিক্ষার্থী, রোগী, নারী, শিশু, কৃষক ও কর্মজীবী মানুষকে রশি টেনে খেয়া নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হতে হচ্ছে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বছরের পর বছর ধরে ধীরগতির নির্মাণকাজ তাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যাহত করছে। বর্ষা মৌসুমে পাহাড়ি ঢলে নদীর স্রোত বেড়ে গেলে পারাপার আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। তারপরও বিকল্প কোনো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই মানুষকে এই ঝুঁকিপূর্ণ পথ বেছে নিতে হচ্ছে।

অর্ধশতকের দুর্ভোগ, এখনও মিলেনি স্থায়ী সমাধান

স্থানীয় সূত্র জানায়, প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে দোয়ারাবাজার উপজেলার সুরমা ইউনিয়নের নুরপুর, আলীপুর, সুনাপুর, বৈঠাখাই ও হাসনবাহার গ্রামের কয়েক হাজার মানুষ আলীপুর-টেংরাটিলা খেয়াঘাট দিয়ে রশি টেনে নৌকায় খাসিয়ামারা নদী পারাপার করছেন।

শুষ্ক মৌসুমে সীমিত ঝুঁকিতে পারাপার সম্ভব হলেও বর্ষায় নদীর প্রবল স্রোত মানুষের দুর্ভোগ কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ করে জরুরি রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থীদের স্কুল-কলেজে যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য পরিবহনে প্রতিনিয়ত ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।

৪ কোটি টাকার প্রকল্প, পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি কাজ

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) দীর্ঘদিনের দাবির পর খাসিয়ামারা নদীর ওপর প্রায় ৭৫ মিটার দীর্ঘ পিসি গার্ডার সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেয়। ২০২২ সালে আলীপুর-টেংরাটিলা খেয়াঘাট এলাকায় ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মাধ্যমে প্রকল্পের কাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়।

প্রায় ৫০০ মিটার চেইনেজে নির্মাণাধীন এই প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ৪ কোটি ২৬ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। তবে কাজ শুরু হওয়ার কয়েক বছর পরও সেতুটি যান চলাচলের জন্য প্রস্তুত হয়নি।

“কখনো কাজ হয়, আবার মাসের পর মাস বন্ধ থাকে”

আলীপুর গ্রামের বাসিন্দা রুমন মিয়া বলেন,
“সেতুটি চালু হলে আমাদের সন্তানদের স্কুলে যাওয়া, রোগীদের হাসপাতালে নেওয়া এবং কৃষিপণ্য পরিবহন অনেক সহজ হবে। কিন্তু পাঁচ বছর ধরে কাজ চলছে ধীরগতিতে। কখনো শ্রমিক আসে, আবার দীর্ঘ সময় কাজ বন্ধ থাকে। আমরা দ্রুত সেতুর কাজ শেষ করার দাবি জানাই।”

স্থানীয় মোটরসাইকেলচালক বিল্লাল হোসেন বলেন,
“এক বছর কাজ হয়, আরেক বছর বন্ধ থাকে। শুনেছি শ্রমিকদের নিয়মিত অর্থ পরিশোধ না হওয়ায় কাজ ব্যাহত হয়েছে। বর্ষাকালে নদী পার হওয়া অত্যন্ত কষ্টকর হয়ে পড়ে।”

রাতেও রোগী পারাপারে ডাক পান মাঝি

খেয়া নৌকার মাঝি আম্বর আলী জানান, গত চার-পাঁচ বছর ধরে নির্মাণকাজ মাঝে মাঝে চললেও দীর্ঘ সময় বন্ধ থাকে।

“রাত এক-দুইটাতেও অসুস্থ রোগী নিয়ে মানুষ ফোন করে নদী পার করে দিতে বলে। সেতুটি চালু হলে কয়েকটি গ্রামের মানুষের বহু বছরের দুর্ভোগ দূর হবে,” বলেন তিনি।

কর্তৃপক্ষ বলছে, শেষ পর্যায়ে কাজ

সুনামগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আনোয়ার হোসেন বলেন, নির্মাণাধীন সেতুর অধিকাংশ কাজ ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে।

তার ভাষ্য, বর্তমানে একটি স্লাব এবং দুই পাশের অ্যাপ্রোচ সড়কের এক পাশের কাজ বাকি রয়েছে। ঠিকাদারকে দ্রুত অবশিষ্ট কাজ শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি এমন পর্যায়ে রয়েছে যে বর্তমান ঠিকাদারের কাজ বাতিল করে নতুন ঠিকাদার নিয়োগ দিলে প্রকল্প বাস্তবায়ন আরও দীর্ঘায়িত হবে। তাই বিদ্যমান ঠিকাদারের মাধ্যমেই দ্রুত কাজ শেষ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

স্থানীয়দের প্রত্যাশা

স্থানীয়দের মতে, খাসিয়ামারা নদীর ওপর সেতুটি চালু হলে পাঁচ গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ সংকট দূর হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও স্থানীয় অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। তাদের একটাই দাবি—আর কোনো প্রতিশ্রুতি নয়, দ্রুত শেষ হোক সেতুর নির্মাণকাজ এবং নিরাপদ যাতায়াতের অধিকার ফিরে পাক এলাকাবাসী।