টাঙ্গাইলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)-এর বহুমুখী উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে গ্রামীণ জনপদে দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। রাস্তাঘাট পাকা করা, সেতু ও কালভার্ট নির্মাণ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্র পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে জেলার প্রান্তিক অঞ্চলের অর্থনৈতিক ও সামাজিক চিত্র দ্রুত বদলে যাচ্ছে।

জেলা এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত টাঙ্গাইল জেলার আওতায় মোট সড়কের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৮২৬ দশমিক ৭০ কিলোমিটার। এর মধ্যে গ্রামীণ অর্থনীতিকে গতিশীল করতে ২ হাজার ৯৪৬ দশমিক ৫০ কিলোমিটার সড়ক বিটুমিনাস কার্পেটিং (বিসি) পদ্ধতিতে পাকা করা হয়েছে। অবশিষ্ট ৬ হাজার ৮৮১ দশমিক ২০ কিলোমিটার কাঁচা সড়ক পর্যায়ক্রমে পাকা করার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এলজিইডি।

এই সড়ক নেটওয়ার্কের মধ্যে উপজেলা সড়ক ৮১৪ দশমিক ৫০ কিলোমিটার, ইউনিয়ন সড়ক ১ হাজার ৭৫ দশমিক ৪০ কিলোমিটার এবং গ্রামীণ সড়ক ৭ হাজার ৯৩৬ দশমিক ৮০ কিলোমিটার। এছাড়া ২৮৬ দশমিক ৭০ কিলোমিটার সড়ক নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের আওতায় রয়েছে।

সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি

সূত্র জানায়, প্রান্তিক মানুষের যাতায়াত ও পণ্য পরিবহন সহজ করতে এসব সড়কে প্রায় ২ হাজার ৫০০ মিটার দৈর্ঘ্যের ব্রিজ ও কালভার্ট নির্মাণ করা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে যোগাযোগ ব্যবস্থার আরও উন্নয়নের লক্ষ্যে ৯৪ দশমিক ৯১৭ কিলোমিটার উপজেলা সড়ক, ৭১ দশমিক ১৭৯ কিলোমিটার ইউনিয়ন সড়ক এবং ৩৯ দশমিক ০৯১ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়কের উন্নয়ন কাজ চলমান রয়েছে।

গ্রামীণ অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে এলজিইডির বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় এ পর্যন্ত ১৬টি আধুনিক হাট-বাজার ও বিভিন্ন ঘাটলা নির্মাণ করা হয়েছে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য সহজেই বাজারে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে।

শিক্ষা খাতেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছে এলজিইডি। প্রাথমিক শিক্ষা অবকাঠামো ব্যবস্থাপনা ইউনিটের আওতায় জেলার বিভিন্ন এলাকায় আধুনিক ও দৃষ্টিনন্দন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এসব বিদ্যালয় প্রান্তিক শিশুদের শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কৃষি ও মৎস্য উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে এলজিইডি পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায়ও বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করেছে। ক্ষুদ্র পানি সম্পদ অবকাঠামো উন্নয়ন এবং দেশব্যাপী পুকুর পুনঃখনন প্রকল্পের আওতায় ইতোমধ্যে ১২ কিলোমিটার খাল পুনঃখনন এবং ৫টি সরকারি দিঘি ও পুকুর খনন সম্পন্ন হয়েছে। পাশাপাশি স্লুইসগেট ও সেচ উপ-প্রকল্পসহ দুটি বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে এবং আরও একটি সেচ উপ-প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে।

টাঙ্গাইল শহরের বাসিন্দা উম্মুল কাউছার, রাফিউর রহমান, আজিজুল হক, আইনজীবী শামসুদ্দিন, নাজিমুদ্দিন, সাগর আহমেদ, শামীমুল ইসলাম, নাসিমুল হক, রেজাউল করিম বাদশা ও হুমায়ুন কবির জানান, জেলা সদরের ডিসি অফিস-এলজিইডি মোড় (বৈল্লা) সড়কটি দীর্ঘদিন অবহেলায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছিল। এলজিইডি সড়কটি পুনর্নির্মাণ করায় এখন সাধারণ মানুষ স্বস্তিতে চলাচল করতে পারছেন।

ধনবাড়ী উপজেলার কৃষক নাজমুল হাসান, পোলট্রি খামারি আজগর আলী, ব্যবসায়ী রহমত হোসেন, আলী ইসলাম, মুদি দোকানদার কায়েম উদ্দিন, শামসুল আলম ও আব্দুল কুদ্দুস জানান, মুশুদ্দী-ঝোপনা সড়কে ব্রিজ নির্মাণ হওয়ায় এখন আর তাদের ৩ থেকে ৪ কিলোমিটার ঘুরে যাতায়াত করতে হয় না। কৃষিপণ্য, পোলট্রি ফিড ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য সহজেই পরিবহন করা যাচ্ছে।

বাসাইল উপজেলার শিক্ষক আবুল কাশেম, হাসান আলী রেজা ও ইসমত আরা, চাকরিজীবী রাশেদ রহমান ও আফজাল হোসেন, ব্যবসায়ী কলিমুল্লাহ এবং আমির হামজা জানান, ঝিনাই নদীর ওপর ব্রিজ নির্মাণের ফলে দাপনাজোর এলাকার ওয়াটার গার্ডেন অ্যান্ড স্পায় যাতায়াত সহজ হয়েছে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য পরিবহন এবং শিক্ষার্থী ও চাকরিজীবীদের চলাচলও অনেক সুবিধাজনক হয়েছে।

টাঙ্গাইল এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, “গ্রামীণ অবকাঠামোর এই টেকসই উন্নয়ন প্রান্তিক মানুষের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়িত হলে জেলার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরও ত্বরান্বিত হবে।”

তিনি আরও বলেন, প্রশাসনের দিকনির্দেশনা, বিভিন্ন অংশীজনের সহযোগিতা এবং মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় জেলার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড সফলভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছে। এর ফলে কৃষি ও অকৃষি উৎপাদন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি খামার এবং বিভিন্ন উৎপাদনমুখী কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত মানুষ উন্নত গ্রামীণ যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা পাচ্ছেন। তারা স্বল্প খরচে দ্রুত সময়ের মধ্যে ঢাকা ও দেশের অন্যান্য জেলার বাজারে পণ্য পরিবহন করতে পারছেন এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হচ্ছেন।