মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সামরিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত একটি নতুন অনুসন্ধানী বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, ইরানের পাল্টা হামলায় অন্তত ২০টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিবিসি ভেরিফাই স্যাটেলাইট চিত্র, উন্মুক্ত ভিডিও ফুটেজ এবং সামরিক বিশ্লেষকদের মতামত পর্যালোচনা করে এই মূল্যায়ন প্রকাশ করেছে।

বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ইরানের হামলার প্রকৃত পরিধি এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা সম্পর্কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তির তুলনায় পরিস্থিতি আরও বিস্তৃত হতে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব এখনো প্রকাশ করা হয়নি এবং অনেক তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

Advertisement

স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে কী দেখা গেছে?

বিবিসি ভেরিফাইয়ের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ইরাক, জর্ডান, বাহরাইন ও ওমানে অবস্থিত মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর মধ্যে অন্তত ২০টি স্থাপনায় হামলার চিহ্ন শনাক্ত করা হয়েছে।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর মধ্যে বিমানঘাঁটি, আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো, জ্বালানি সংরক্ষণাগার এবং সামরিক সহায়ক সুবিধাও রয়েছে।

কিছু প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকের মতে, প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনার সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক মার্কিন নিশ্চিতকরণ পাওয়া যায়নি।

আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাও লক্ষ্যবস্তু

বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানে মোতায়েন থাকা যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক **THAAD (Terminal High Altitude Area Defense)** ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার কয়েকটি ইউনিট হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, THAAD বিশ্বের অন্যতম উন্নত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং এর প্রতিটি ব্যাটারির কৌশলগত মূল্য অত্যন্ত বেশি। ফলে এসব স্থাপনায় আঘাত আঞ্চলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে।

বিমান ও সামরিক সরঞ্জামের ক্ষয়ক্ষতির দাবি

স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে মার্কিন নজরদারি ও জ্বালানি সরবরাহকারী কিছু বিমানের ক্ষতির ইঙ্গিত পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

একাধিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক ক্ষতিগ্রস্ত বিমানগুলোর মধ্যে একটি উন্নত সতর্কীকরণ ও নজরদারি বিমান থাকার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেনি।

যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান

বিবিসি ভেরিফাইয়ের অনুসন্ধান প্রসঙ্গে একজন মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান।

পেন্টাগন পূর্বে জানিয়েছিল, ইরানের বিরুদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানে হাজার হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানো হয়েছে। একই সঙ্গে ওয়াশিংটন বারবার দাবি করে আসছে যে ইরানের সামরিক সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে।

তবে সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

যুদ্ধকৌশলে পরিবর্তনের ইঙ্গিত

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, সংঘাতের শুরুতে ইরান তুলনামূলকভাবে বৃহৎ পরিসরে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালালেও পরে তারা আরও নির্দিষ্ট ও কৌশলগত লক্ষ্যবস্তুর দিকে মনোযোগ দেয়।

মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টিমসন সেন্টারের বিশ্লেষক কেলি গ্রিকোর মতে, পরবর্তী পর্যায়ে ইরান উচ্চমূল্যের সামরিক সম্পদ, প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো লক্ষ্য করে তুলনামূলকভাবে নির্ভুল হামলার কৌশল গ্রহণ করে।

আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ

বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, বর্তমান যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো আরও বড় ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

এছাড়া দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত আকাশ প্রতিরক্ষা ক্ষেপণাস্ত্র, সামরিক সরঞ্জাম ও কৌশলগত মজুদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা।

এখনো রয়ে গেছে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন

স্যাটেলাইট চিত্রে ক্ষয়ক্ষতির বহু ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বাস্তব ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ মূল্যায়নের জন্য আরও সরকারি তথ্য, স্বাধীন তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে।

বর্তমান পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিবেশ অত্যন্ত সংবেদনশীল। ফলে যুদ্ধরত পক্ষগুলোর দাবি ও পাল্টা দাবির বাইরে নিরপেক্ষ তথ্য যাচাই আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।