ইরানের সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতা চুক্তি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট Donald Trump এখন নিজ দল রিপাবলিকান পার্টির ভেতরেই প্রবল চাপের মুখে পড়েছেন। মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার স্থিতিশীল করার প্রয়োজনীয়তা একদিকে তাকে সমঝোতার পথে ঠেলে দিচ্ছে, অন্যদিকে ইরানকে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়ার আশঙ্কায় ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছেন দলের কট্টরপন্থী নেতারা।

আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে একটি অন্তর্বর্তীকালীন খসড়া চুক্তি নিয়ে আলোচনা অগ্রসর হয়েছে এবং উভয় পক্ষ একটি সমঝোতার কাছাকাছি পৌঁছেছে। সম্ভাব্য এই সমঝোতা কার্যকর হলে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে শুরু হওয়া সামরিক উত্তেজনার পর সেটি হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক অগ্রগতি।

Advertisement

খসড়া চুক্তিতে যুদ্ধবিরতির মেয়াদ বাড়ানো এবং বৈশ্বিক জ্বালানি পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি পুনরায় উন্মুক্ত রাখার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকলেও, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে চূড়ান্ত সমাধান আপাতত স্থগিত রাখা হয়েছে বলে জানা গেছে।

এই অবস্থানেই আপত্তি তুলেছেন রিপাবলিকান দলের প্রভাবশালী সিনেটররা। Lindsey Graham, Roger Wicker এবং Ted Cruz প্রকাশ্যে ট্রাম্পকে সতর্ক করে বলেছেন, ইরানের সঙ্গে আপস করে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত অবস্থান দুর্বল করা উচিত হবে না।

তাদের দাবি, বর্তমান আলোচনার ফলাফল শেষ পর্যন্ত সাবেক প্রেসিডেন্ট Barack Obama-এর আমলে হওয়া ২০১৫ সালের পারমাণবিক চুক্তির পুনরাবৃত্তি হয়ে দাঁড়াতে পারে—যে চুক্তিকে ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে “দুর্বল ও অকার্যকর” আখ্যা দিয়ে বাতিল করেছিলেন।

হোয়াইট হাউজের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আলোচনায় তার “চূড়ান্ত সীমা” স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তার ভাষায়, “ইরান কখনোই যেন পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করেই কেবল কোনো সমঝোতা হবে।”

তবে কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, আলোচনায় এখনো নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ইরানের পরমাণু সক্ষমতার ভবিষ্যৎ এবং হরমুজ প্রণালির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা নিয়ে সুস্পষ্ট রূপরেখা নির্ধারিত হয়নি। ফলে চুক্তিটি ট্রাম্প প্রশাসনের পূর্বঘোষিত “শর্তহীন আত্মসমর্পণ” বা ইরানের পরমাণু কর্মসূচি পুরোপুরি ধ্বংস করার অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে আসা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

ওয়াশিংটনভিত্তিক থিংক ট্যাংক “ইউনাইটেড অ্যাগেইন্সট নিউক্লিয়ার ইরান”-এর নীতিনির্ধারণ পরিচালক জেসন ব্রডস্কি মন্তব্য করেছেন, সম্ভাব্য সমঝোতায় ইরানই তুলনামূলক বেশি কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে। তার মতে, “পরমাণু আলোচনা নিয়ে অতিরিক্ত আশাবাদ দেখানোর আগে সতর্ক থাকা উচিত।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের জন্য বিষয়টি কেবল পররাষ্ট্রনীতি নয়, অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানি তেলের উচ্চমূল্য রিপাবলিকানদের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও বাড়তে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে মার্কিন ভোটারদের ওপর।

তবে সমালোচনার মধ্যেও ট্রাম্প আপাতত অনড় অবস্থান বজায় রেখেছেন। সম্প্রতি মন্ত্রিসভার বৈঠকে তিনি বলেছেন, মধ্যবর্তী নির্বাচন নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও কৌশলগত স্বার্থই তার অগ্রাধিকার।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানও নিজেদের অবস্থানকে তুলনামূলক শক্তিশালী মনে করছে। কারণ, পশ্চিমা চাপ ও সামরিক হামলার ঝুঁকি মোকাবিলা করেও তারা বৈশ্বিক তেল সরবরাহের অন্যতম প্রধান পথ হরমুজ প্রণালিকে কার্যত কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে সক্ষম হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান “সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ”-এর মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ জন অল্টারম্যানের ভাষায়, “ট্রাম্প দ্রুত যুদ্ধের অবসান চান—এমন বার্তাই স্পষ্ট হচ্ছে। আর সেটিই ইরানকে আলোচনায় আরও কঠোর অবস্থান নিতে উৎসাহিত করছে।”