অর্থনৈতিক অবরোধ, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং দীর্ঘমেয়াদি মূল্যস্ফীতির চাপে বিপর্যস্ত ইরানে এবার ঈদুল আজহা এসেছে গভীর অর্থনৈতিক সংকটের আবহে। দেশটির সরকার সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে কোরবানির মাংস পৌঁছে দিতে ভর্তুকিমূল্যে বিক্রির উদ্যোগ নিলেও, বাজারে মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি জনজীবনে বাড়তি চাপ তৈরি করেছে।
ইরানে ঈদুল আজহা তুলনামূলক সীমিত পরিসরে উদযাপিত হলেও মসজিদ ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠাননির্ভর কোরবানি কার্যক্রম সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি বছরের মতো এবারও সরকার অনুমোদিত কেন্দ্রগুলোতে শরিয়াহসম্মত ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে পশু কোরবানির ব্যবস্থা করেছে। একই সঙ্গে এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে বাজারমূল্যের চেয়ে কম দামে মাংস সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তেহরান সিটি করপোরেশনের এক ঘোষণায় জানানো হয়েছে, নির্ধারিত বিক্রয়কেন্দ্রে প্রতি কেজি কোরবানির মাংস ৭৪ লাখ রিয়ালে বিক্রি করা হচ্ছে, যা আন্তর্জাতিক বাজারদরে প্রায় ৪ দশমিক ৩০ মার্কিন ডলারের সমপরিমাণ। তবে সাধারণ বাজারে একই মাংসের দাম অঞ্চল ও মানভেদে সরকারি দামের তিন গুণ পর্যন্ত বেশি।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে শ্রমজীবী মানুষের জন্য। ইরানে বর্তমানে একজন শ্রমিকের মাসিক সর্বনিম্ন মজুরি ১০০ মার্কিন ডলারেরও কম। ফলে লাল মাংস অনেক পরিবারের জন্য এখন প্রায় বিলাসপণ্যে পরিণত হয়েছে।
তেহরানের এক বাসিন্দা আল জাজিরাকে বলেন, আগে নিয়মিত মাংস কেনা গেলেও এখন তিন সপ্তাহে একবারও কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। তার ভাষায়, “অনেক পরিবার এখন লাল মাংসের বদলে মুরগি, ডিম ও ডালজাতীয় খাবারের ওপর নির্ভর করছে। কিন্তু এসব পণ্যের দামও দ্রুত বাড়ছে।”
দেশটির মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের প্রতিনিধি মাসুদ রাসুলি জানিয়েছেন, গত বছরের তুলনায় লাল মাংসের চাহিদা প্রায় ৫০ শতাংশ কমে গেছে। যদিও সরকার আমদানির মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ সচল রাখার চেষ্টা করছে, তবে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে চাহিদা দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে।
ইরানের পরিসংখ্যান কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, চলতি পারস্য বর্ষপঞ্জির প্রথম মাসে দেশটির বার্ষিক মূল্যস্ফীতি ৭৩ শতাংশ ছাড়িয়েছে। একই সময়ে চালের দাম বেড়েছে ১৭৩ শতাংশ, মুরগির দাম ১৯১ শতাংশ এবং ভোজ্যতেলের দাম বেড়েছে চার গুণের বেশি। অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, আগামী মাসগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, মার্কিন নিষেধাজ্ঞা, বৈদেশিক বাণিজ্যে সীমাবদ্ধতা, আঞ্চলিক উত্তেজনা এবং অভ্যন্তরীণ অব্যবস্থাপনার সমন্বিত প্রভাবেই ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চাপে রয়েছে। সরকার মূল্যনিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিলেও তা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে কার্যকর হচ্ছে না।
এদিকে ঈদুল আজহার ধর্মীয় আবহেও রাজনৈতিক বক্তব্য উঠে এসেছে ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের ভাষণে। তেহরানে ঈদের প্রধান জামাতে খুতবা দিতে গিয়ে কট্টরপন্থি আলেম আয়াতুল্লাহ আহমদ খাতামি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কঠোর বক্তব্য দেন এবং ইরানের ওপর চাপ প্রয়োগের নীতির সমালোচনা করেন।
অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান ঈদকে “অত্যাচার ও আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে মর্যাদা ও স্বাধীনতার প্রতীক” হিসেবে উল্লেখ করেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচিও পশ্চিম এশিয়ায় যুদ্ধ, বৈষম্য ও দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে মুসলিম বিশ্বের বৃহত্তর ঐক্যের আহ্বান জানান।
অর্থনৈতিক সংকটের গভীরতার মধ্যেও ধর্মীয় উৎসবকে ঘিরে সামাজিক সংহতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে ইরান সরকার। তবে বাজার পরিস্থিতি এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি দেশটির সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রাকে আরও অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
