ফিলিং স্টেশনে জ্বালানি নেওয়ার সময় অধিকাংশ গ্রাহকই নির্ভর করেন ডিজিটাল ডিসপ্লের ওপর। মিটারে নির্দিষ্ট লিটার বা টাকার হিসাব দেখালেই ধরে নেওয়া হয় সঠিক পরিমাণ তেল সরবরাহ করা হয়েছে। কিন্তু সাম্প্রতিক কয়েকটি অভিযানে উঠে এসেছে ভিন্ন বাস্তবতা। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক ডিসপেন্সিং ইউনিট ব্যবহার করেই কিছু অসাধু চক্র গোপনে কম জ্বালানি সরবরাহ করছে— অথচ তা সহজে বুঝতে পারছেন না সাধারণ ভোক্তারা।

বিশ্ব পরিমাপবিদ্যা দিবসকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)-এর একাধিক অভিযানে এমন অনিয়মের প্রমাণ মিলেছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এখন আর আগের মতো প্রকাশ্য যান্ত্রিক কারচুপি বেশি হয় না; বরং প্রতারণার বড় অংশই হচ্ছে সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সেটিংসের মাধ্যমে।

কীভাবে হচ্ছে ‘ডিজিটাল’ কারসাজি

বিশেষজ্ঞদের ভাষ্য অনুযায়ী, আধুনিক জ্বালানি ডিসপেন্সিং ইউনিট সেন্সর, পালস জেনারেটর, সফটওয়্যার ও কন্ট্রোল সার্কিটের সমন্বয়ে পরিচালিত হয়। জ্বালানি প্রবাহের তথ্য ডিজিটাল সংকেতে রূপান্তর হয়ে ডিসপ্লেতে প্রদর্শিত হয়।

কারচুপির ক্ষেত্রে মূলত এই হিসাব প্রক্রিয়াতেই হস্তক্ষেপ করা হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সফটওয়্যারের ‘পালস রেশিও’ পরিবর্তন করে এমনভাবে সেটিংস করা হয়, যাতে ডিসপ্লেতে পূর্ণ পরিমাণ দেখালেও বাস্তবে কিছু কম তেল সরবরাহ হয়। আবার কোথাও অতিরিক্ত চিপ বা পরিবর্তিত সার্কিট বসিয়ে মিটারের পাঠ পরিবর্তন করার অভিযোগও রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি লিটারে ২০ থেকে ৩০ মিলিলিটার কম সরবরাহ সাধারণ গ্রাহকের পক্ষে বোঝা প্রায় অসম্ভব। কিন্তু দিনে শত শত গাড়িতে জ্বালানি বিক্রির মাধ্যমে এই সামান্য ঘাটতিই বড় অঙ্কের অবৈধ মুনাফায় পরিণত হয়।

অভিযানে যা পাওয়া গেছে

মার্চ মাসে জ্বালানি সংকটের সময় চট্টগ্রামের বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে বিএসটিআই অভিযান চালায়। অভিযানে একাধিক প্রতিষ্ঠানে কম জ্বালানি সরবরাহের প্রমাণ পাওয়া যায়।

বিএসটিআই সূত্রে জানা গেছে, নগরের গোসাইলডাঙ্গা, নাসিরাবাদ, কাটগড়, পাহাড়তলী ও সীতাকুণ্ড এলাকার কয়েকটি ফিলিং স্টেশনে নির্ধারিত পরিমাণের তুলনায় কম ডিজেল ও অকটেন সরবরাহ ধরা পড়ে। কোথাও প্রতি ৫ লিটারে ৪০ মিলিলিটার, কোথাও ৭০ থেকে ১২০ মিলিলিটার পর্যন্ত ঘাটতি পাওয়া গেছে। এসব ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে জরিমানা করা হয়।

অভিযানে অংশ নেওয়া কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বিএসটিআইয়ের নিরাপত্তা সিল অক্ষত ছিল। অর্থাৎ বাহ্যিকভাবে মেশিন স্বাভাবিক থাকলেও সফটওয়্যারভিত্তিক সেটিংস বদলে কারচুপি করা হচ্ছিল।

গ্রাহকদের অভিযোগ: মাইলেজ কমছে

অনেক গাড়িচালক বলছেন, নির্দিষ্ট কিছু স্টেশন থেকে জ্বালানি নিলে গাড়ির মাইলেজে পার্থক্য দেখা যায়।

চট্টগ্রামের এক ব্যক্তিগত গাড়িচালক জানান, পরিচিত কিছু পাম্প থেকে জ্বালানি নিলে গাড়ি বেশি দূর চলে, কিন্তু অন্য কিছু স্টেশন থেকে একই পরিমাণ অকটেন নেওয়ার পরও তুলনামূলক কম মাইলেজ পাওয়া যায়। তবে মিটারে সব স্বাভাবিক দেখায় বলে অভিযোগ প্রমাণ করা কঠিন।

রাইডশেয়ার চালকদেরও একই ধরনের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিদিন কয়েকশ টাকা তেল নেওয়ার পরও কিছু পাম্পে প্রত্যাশিত মাইলেজ পাওয়া যায় না।

কেন ধরা কঠিন

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডিজিটাল ডিসপেন্সিং ইউনিটের সফটওয়্যার সাধারণভাবে পরীক্ষা করে কারচুপি শনাক্ত করা যায় না। অনেক সময় বিশেষ ক্যালিব্রেশন টেস্ট ও সফটওয়্যার অডিট প্রয়োজন হয়।

বাংলাদেশে অধিকাংশ ফিলিং স্টেশনে এখনো রিয়েল-টাইম ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা চালু হয়নি। ফলে নিয়মিত নজরদারির অভাবে দীর্ঘ সময় ধরে অনিয়ম চললেও তা ধরা পড়ে না।

বিএসটিআই কর্মকর্তারা জানান, আকস্মিক অভিযান চালিয়ে স্ট্যান্ডার্ড পরিমাপক পাত্রের মাধ্যমে জ্বালানি মেপে প্রকৃত সরবরাহ যাচাই করা হয়। নির্ধারিত সহনসীমার বাইরে ঘাটতি পাওয়া গেলে তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।

আইন কী বলছে

বাংলাদেশের ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন-২০১৮ অনুযায়ী, পরিমাপে কম দেওয়া বা কারচুপি করা দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ধরনের অপরাধে সর্বোচ্চ এক বছর কারাদণ্ড, এক লাখ টাকা জরিমানা বা উভয় দণ্ডের বিধান রয়েছে।

বিএসটিআইয়ের পরিদর্শকরা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালিয়ে যন্ত্র পরীক্ষা ও জব্দ করতে পারেন। এছাড়া মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও শাস্তির ব্যবস্থাও রয়েছে।

ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতারণা ঠেকাতে শুধু প্রতীকী অভিযান যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন নিয়মিত সফটওয়্যার অডিট, কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং কঠোর নজরদারি।

তাদের মতে, ডিজিটাল প্রযুক্তি যেমন সেবা সহজ করেছে, তেমনি প্রতারণার কৌশলও আরও জটিল করেছে। ফলে গ্রাহক সুরক্ষায় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকেও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে।

বিশ্ব পরিমাপবিদ্যা দিবসের প্রেক্ষাপট

প্রতি বছর ২০ মে বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব পরিমাপবিদ্যা দিবস। ১৮৭৫ সালে ফ্রান্সে ‘মিটার কনভেনশন’ স্বাক্ষরের স্মরণে দিবসটি পালন করা হয়। এবারের প্রতিপাদ্য— “নীতি নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় আস্থা নির্মাণে মেট্রোলজি”।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সঠিক পরিমাপ শুধু প্রযুক্তিগত বিষয় নয়; এটি ভোক্তার আস্থা, বাজারের স্বচ্ছতা এবং অর্থনৈতিক ন্যায্যতার সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত। তাই ডিজিটাল যুগে প্রতারণা ঠেকাতে প্রয়োজন আরও কার্যকর ও আধুনিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা।