২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৬ সালের এপ্রিল—মাত্র দেড় বছরের ব্যবধানে হাইকোর্ট বিভাগ থেকে বিদায় নিয়েছেন ১৫ জন বিচারপতি। তাদের কেউ স্বাভাবিক অবসরে যাননি। দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অসদাচরণ এবং রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে কেউ পদত্যাগ করেছেন, কেউ অপসারিত হয়েছেন, আবার কেউ স্থায়ী নিয়োগ পাননি। বিচার বিভাগের ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এতসংখ্যক বিচারপতির বিদায়কে নজিরবিহীন ঘটনা হিসেবে দেখছেন আইন বিশ্লেষকরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, উচ্চ আদালতে জবাবদিহি নিশ্চিতের এই প্রক্রিয়া বিচার বিভাগের অন্য সদস্যদের জন্যও স্পষ্ট সতর্কবার্তা।

সুপ্রিম কোর্ট সূত্রে জানা গেছে, অভিযোগ তদন্তাধীন থাকা অবস্থায় পাঁচ বিচারপতি পদত্যাগ করেন। সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের অনুসন্ধানে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় তিন বিচারপতিকে অপসারণ করা হয়। আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া দুই অতিরিক্ত বিচারপতিকে স্থায়ী করা হয়নি। এছাড়া বিচারকাজ থেকে বিরত অবস্থায় বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় দুই বিচারপতি অবসরে যান।

সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান সিদ্দিকী গণমাধ্যমকে বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগে ১২ বিচারপতিকে ছুটিতে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে ১০ জন আর বিচারকাজে ফেরেননি। একজনের বিরুদ্ধে তদন্ত এখনও চলমান, আরেকজন অভিযোগের প্রমাণ না পাওয়ায় পুনরায় দায়িত্বে ফিরেছেন।

বর্তমানে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে বিচারপতি শেখ হাসান আরিফের বিষয়ে তদন্ত চলছে। বিচারপতি এস এম মনিরুজ্জামান অভিযোগ থেকে অব্যাহতি পেয়ে বিচারকাজে ফিরেছেন। অন্যদিকে বিচারপতি মামনুন রহমান ও বিচারপতি রেজাউল হাসান তদন্ত চলাকালে পদত্যাগ করেন।

২০২৪ সালের ১৬ অক্টোবর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমেদ ১২ বিচারপতিকে বিচারকাজ থেকে বিরত রাখেন। তাদের বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদী সরকারের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখা, দুর্নীতি ও বিচারিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠে।

আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা রক্ষায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অ্যাডভোকেট সৈয়দ মামুন মাহবুব বলেন,
“বিচার বিভাগের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে সততা, নিরপেক্ষতা ও জনগণের আস্থা। অতীতের ঘটনাগুলো থেকে শিক্ষা না নিলে ভবিষ্যতে বিচার বিভাগের জন্য আরও বড় সংকট তৈরি হতে পারে।”

তিনি আরও বলেন, “বাংলাদেশে কেউই আইনের ঊর্ধ্বে নয়। বিচার বিভাগকে দলীয় প্রভাবমুক্ত ও স্বাধীনভাবে পরিচালিত হওয়া জরুরি।”

যেসব বিচারপতি বিদায় নিয়েছেন
বিচারপতি নাইমা হায়দার

ফ্যাসিবাদী সরকারের সহযোগী হিসেবে ভূমিকা রাখা এবং বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে বিচারকাজ থেকে বিরত থাকার পর ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে পদত্যাগ করেন। রাষ্ট্রপতি তার পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেন।

বিচারপতি মামনুন রহমান

দীর্ঘদিন ছুটিতে থাকার পর ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে কানাডা থেকে পদত্যাগপত্র পাঠান। পরে রাষ্ট্রপতি তা গ্রহণ করেন।

বিচারপতি মো. আমিনুল ইসলাম ও বিচারপতি এস এম মাসুদ হোসেন দোলন

আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া এই দুই অতিরিক্ত বিচারপতিকে স্থায়ী করা হয়নি। অভিযোগ ছিল, তারা রাজনৈতিক প্রভাবের অধীনে বিচারিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন।

বিচারপতি খিজির হায়াত

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ২০২৫ সালের মার্চে তাকে অপসারণ করা হয়।

বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামান

ক্ষমতার অপব্যবহার ও অনিয়মের অভিযোগে ২০২৫ সালের মে মাসে রাষ্ট্রপতির আদেশে অপসারিত হন।

বিচারপতি রেজাউল হাসান

দুর্নীতি, পক্ষপাতমূলক রায় এবং বিচারিক অসদাচরণের অভিযোগ ওঠার পর তদন্ত চলাকালে পদত্যাগ করেন।

বিচারপতি আক্তারুজ্জামান

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলার রায়দানকারী এই বিচারপতি অনিয়মের অভিযোগে ছুটিতে যাওয়ার পর পদত্যাগ করেন।

বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকার

সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল তাকে বিচারিক দায়িত্ব পালনে অযোগ্য ঘোষণা করলে রাষ্ট্রপতির আদেশে অপসারণ করা হয়।

বিচারপতি শাহেদ নূরউদ্দিন

অভিযোগ তদন্ত চলাকালে কানাডা থেকে পদত্যাগপত্র পাঠান।

বিচারপতি আতাউর রহমান খান ও বিচারপতি আশীষ রঞ্জন দাস

বিচারকাজ থেকে বিরত অবস্থায় চাকরির বয়সসীমা পূর্ণ হওয়ায় অবসরে যান।

বিচারপতি সালমা মাসুদ চৌধুরী, বিচারপতি কাজী রেজাউল হক ও বিচারপতি এ কে এম জহিরুল হক

দীর্ঘদিন বিচারকাজ থেকে বিরত থাকার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে পদত্যাগ করেন। তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও বিচারিক অনিয়মের অভিযোগ ছিল।

সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বিচার বিভাগের ভেতরে শুদ্ধি অভিযান ও জবাবদিহি নিশ্চিতের এই প্রক্রিয়া ভবিষ্যতে বিচারিক স্বাধীনতা ও জনআস্থা পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।