কালবৈশাখী ঝড় ও টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে দেশের প্রধান লবণ উৎপাদন অঞ্চল কক্সবাজারের উপকূলীয় এলাকা। আকস্মিক বৈরী আবহাওয়ায় বিস্তীর্ণ লবণ মাঠ পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মৌসুমের শেষ প্রান্তে এসে চরম ক্ষতির মুখে পড়েছেন হাজারো প্রান্তিক লবণচাষি। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ পরিস্থিতিতে অন্তত এক লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে।

বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক) সূত্র জানিয়েছে, কক্সবাজার উপকূলের প্রায় ৬৮ হাজার একর লবণ মাঠ ঝড়-বৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর ফলে কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। দেশের মোট লবণের প্রায় ৯৫ শতাংশ উৎপাদিত হয় কক্সবাজার ও আশপাশের উপকূলীয় এলাকায়। পুরো উৎপাদন ব্যবস্থাই প্রকৃতিনির্ভর হওয়ায় অকাল বৃষ্টি ও ঝড় সরাসরি উৎপাদনে বড় ধাক্কা তৈরি করেছে।

চলতি মৌসুমের শুরুতে আবহাওয়া অনুকূলে না থাকলেও পরবর্তী সময়ে তীব্র তাপদাহে উৎপাদন বাড়তে শুরু করে। দৈনিক উৎপাদন ১২ হাজার মেট্রিক টন থেকে বেড়ে প্রায় ৩২ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছায়। তবে গত দুই দিনের বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় মাঠে মজুত বিপুল পরিমাণ লবণ গলে গেছে। অনেক এলাকায় লবণ উৎপাদনের জন্য প্রস্তুত করা বেড বা ‘কাই’ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় উৎপাদন কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে।

বিসিকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কক্সবাজার সদর, কুতুবদিয়া, মহেশখালী, পেকুয়া, চকরিয়া, ঈদগাঁও, টেকনাফ এবং চট্টগ্রামের বাঁশখালী উপজেলায় ৬৮ হাজার ৫০৫ একর জমিতে লবণচাষ হয়েছে। এ পর্যন্ত উৎপাদিত লবণের পরিমাণ ১৩ লাখ ৭৩ হাজার ২৭২ টন, যা গত মৌসুমের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৪ লাখ ৪৯ হাজার টন কম। গত বছর একই সময়ে উৎপাদন হয়েছিল ১৮ লাখ ২২ হাজার ১৬২ টন। এ মৌসুমে মোট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৮ লাখ ১০ হাজার টন, যেখানে দেশে বার্ষিক চাহিদা প্রায় ২৭ লাখ ৩৫ হাজার টন।

ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের অভিযোগ, ধারদেনা করে মাঠ প্রস্তুত করলেও শেষ সময়ে এসে বৃষ্টিতে সবকিছু ভেস্তে গেছে। অনেকেই এখন মাঠের পানি সরানো ও ক্ষতিগ্রস্ত ত্রিপল মেরামতে ব্যস্ত। তবে আবহাওয়া স্বাভাবিক না হলে নতুন করে উৎপাদন শুরু করা কঠিন হয়ে পড়বে বলে জানান তারা।

চৌফলদণ্ডীর লবণচাষি নুরুল ইসলাম বলেন, “মৌসুমের শেষ দিকে এসে এক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই কয়েকশ মণ লবণ পানিতে মিশে গেছে। নতুন করে মাঠ প্রস্তুত করতে অন্তত এক সপ্তাহ লাগবে।”

খুরুশকুল এলাকার চাষি গিয়াস উদ্দিন জানান, শনিবারের বৃষ্টিতে কয়েকশ একর মাঠে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বলেন, “লোকসান দিয়েই এতদিন লবণ বিক্রি করেছি। এখন উৎপাদনও বন্ধ। ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করব বুঝতে পারছি না।”

মাতারবাড়ির চাষি আলী আহমদ বলেন, “ঋণ করে মাঠ নিয়েছি। বৃষ্টিতে সব শেষ হয়ে গেল। লবণের দামও কম। এখন সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়েছে।”

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মাতারবাড়ি, হোয়াইক্যং, হ্নীলা, রঙিখালী, শাহপরীরদ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় লবণ মাঠে পানি জমে রয়েছে। এতে প্রায় ৪০ হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মো. আব্দুল হান্নান বলেন, “লঘুচাপ ও পশ্চিমা বায়ুর প্রভাবে উপকূলে বৈরী আবহাওয়া সৃষ্টি হয়েছে। সামুদ্রিক এলাকায় বাতাসের গতিবেগ বেড়ে যাওয়ায় জোয়ারের পানি মাঠে ঢুকে ক্ষয়ক্ষতি বাড়িয়েছে। আগামী কয়েক দিন আংশিক মেঘলা আকাশ ও বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।”

গোমাতলী এলাকার লবণ মিল মালিক আবু শামা বলেন, “কোরবানির মৌসুমে কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে বিপুল পরিমাণ লবণ প্রয়োজন হয়। উৎপাদন ব্যাহত হলে বাজারে সরবরাহ সংকট ও মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা তৈরি হবে।”

কক্সবাজার লবণ শিল্প উন্নয়ন কার্যালয়ের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাফর ইকবাল ভূঁইয়া জানান, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় এক লাখ মেট্রিক টন লবণ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি বলেন, “ক্ষতিগ্রস্তদের তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় অঞ্চলে আবহাওয়ার অস্বাভাবিকতা বাড়ছে। টেকসই পরিকল্পনা ও আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা না গেলে ভবিষ্যতে দেশের লবণ শিল্প আরও বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।