টানা ভারী বর্ষণে কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চলে দেখা দিয়েছে মৌসুমের শুরুতেই কৃষি বিপর্যয়ের আশঙ্কা। গত ৩৬ ঘণ্টায় জেলায় প্রায় ১৯১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এতে জেলার বিভিন্ন হাওর ও নিম্নাঞ্চলে অন্তত ৩ হাজার হেক্টর বোরোধানের জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে বলে জানিয়েছে কৃষি বিভাগ। আকস্মিক এ জলাবদ্ধতায় ধান কাটার মৌসুমে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন কৃষকরা।
বুধবার (২৯ এপ্রিল) বিকেল সোয়া ৩টার দিকে নিকলী আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের সিনিয়র পর্যবেক্ষক আখতার ফারুক জানান, গত ২৪ ঘণ্টায় দুপুর ১২টা পর্যন্ত ১৬০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আগের দিনের বৃষ্টিপাতসহ গত ৩৬ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টিপাত দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৯১ মিলিমিটারে। একই সময়ে জেলার সর্বনিম্ন তাপমাত্রা নেমে এসেছে ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসে। আগামী ২৪ ঘণ্টাতেও বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অতিবৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন হাওরাঞ্চল ও নিম্নভূমিতে দ্রুত পানি জমে বিস্তীর্ণ ফসলি জমি প্লাবিত হয়েছে। মাঠপর্যায়ের প্রাথমিক হিসাবে অন্তত ৩ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে যেসব জমির ধান এখনো কাটা হয়নি, সেগুলো সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, আকস্মিক বৃষ্টিতে অনেক জমির পাকা ধান পানির নিচে ডুবে গেছে। কোথাও কোথাও কৃষকরা কোমরসমান পানিতে নেমে ধান কাটার চেষ্টা করছেন। তবে লাগাতার বৃষ্টির কারণে কাটা ধান শুকানো সম্ভব হচ্ছে না, ফলে উৎপাদিত ধান নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিও বাড়ছে।
হাওরাঞ্চলের কৃষকদের ভাষ্য, কয়েক মাসের পরিশ্রমের একমাত্র বোরো ফসল নিয়ে এখন তারা চরম দুশ্চিন্তায়। অনেকেই ঋণ করে আবাদ করেছেন; ফসলহানি হলে তাদের জন্য ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন হবে।
এদিকে অতিবৃষ্টির কারণে জেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজি ক্ষেতেও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষি বিভাগ বলছে, বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান বলেন,
“মাঠপর্যায়ের প্রাপ্ত তথ্যে প্রায় ৩ হাজার হেক্টর জমি পানির নিচে গেছে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। আমরা কৃষকদের দ্রুত ধান কাটার পরামর্শ দিচ্ছি এবং পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছি।”
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে মৌসুমের বাইরে অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যা এখন হাওরাঞ্চলের কৃষির জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে আগাম সতর্কতা, দ্রুত ফসল কর্তন ব্যবস্থা এবং কার্যকর কৃষি বীমা ছাড়া কৃষকদের সুরক্ষা দেওয়া কঠিন হবে।
হাওরের বিস্তীর্ণ জনপদে এখন একটাই প্রশ্ন—বৃষ্টি থামার আগেই ফসল ঘরে তোলা যাবে তো?