গণবিক্ষোভ বা লংমার্চের নামে গণদুর্ভোগ সৃষ্টি না করে জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী গঠনমূলক বিকল্প প্রস্তাব দিয়ে দেশ পুনর্গঠনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সহযোগিতা করতে বিরোধী দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব ও ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স।
তিনি বলেছেন, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দলের দাবি উত্থাপন, সরকারের সমালোচনা এবং শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করার অধিকার রয়েছে। বিএনপি সরকার সেই অধিকারকে সম্মান করে। তবে দাবি উত্থাপনের নামে রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানকে বিতর্কিত করা কিংবা জনগণের নির্বাচিত সরকারকে অস্থিতিশীল করার কোনো প্রচেষ্টা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
আজ শুক্রবার বিকেলে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট উপজেলার ধুরাইল ইউনিয়নের উত্তর রামনগর (বনপাড়া) এলাকায় প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১০ শয্যাবিশিষ্ট ধুরাইল ইউনিয়ন হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন ও নির্মাণকাজের উদ্বোধন উপলক্ষে আয়োজিত জনসমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
বিরোধী দলের ক্রমাগত অপপ্রচারের সমালোচনা করে এমরান সালেহ প্রিন্স অভিযোগ করেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে ফ্যাসিবাদের দোসরদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে জামায়াত-এনসিপি জোটের নেতারা বিভিন্ন ইস্যুতে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছেন। উসকানিমূলক বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক বয়ান এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণার মাধ্যমে জনগণকে বিভ্রান্ত ও দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা চলছে।
তিনি বলেন, “গতকাল অনুষ্ঠিত ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনের শুরু থেকেই জামায়াত-এনসিপি জোটের নেতারা বিভিন্ন ইস্যুতে লাগামহীন অপপ্রচার চালিয়েছেন। তারা বিএনপির প্রার্থীকে পরাজিত করে সরকারকে লালকার্ড দেখানোর জন্য ভোটারদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু সচেতন জনগণ উপনির্বাচনে উল্টো বিরোধী দলকেই লালকার্ড দেখিয়ে বিএনপির প্রার্থীকে বিজয়ী করেছেন।”
তিনি আরও বলেন, “ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচনের ফলাফল বিরোধী দলের জন্য একটি সুস্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা। জনগণ এখন নেতিবাচক নয়, ইতিবাচক রাজনীতি দেখতে চায়। তারা জানে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিএনপি সরকার জনগণের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কাজ করছে। তাই জনগণ বিরোধী দলের অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হয়ে বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছে। এই জনরায় থেকে বিরোধী দলের শিক্ষা নেওয়া উচিত।”
বিএনপির এই নেতা বলেন, একটি উপনির্বাচনের ফলাফলকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হেয় করা নয়, বরং জনগণের প্রত্যাশা উপলব্ধি করাই গুরুত্বপূর্ণ। বিরোধী দলকে বুঝতে হবে, অপপ্রচার ও উসকানি দিয়ে সাময়িক রাজনৈতিক উত্তেজনা সৃষ্টি করা গেলেও জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। জনগণের আস্থা অর্জন করতে হলে জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি, বাস্তবসম্মত বিকল্প প্রস্তাব এবং দায়িত্বশীল রাজনৈতিক আচরণ প্রয়োজন।
এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “বিরোধী দলকে মনে রাখতে হবে, গণঅভ্যুত্থানের পর জনগণ আর সংঘাত, বিশৃঙ্খলা ও নেতিবাচক রাজনীতি দেখতে চায় না। জনগণ চায় শান্তি, স্থিতিশীলতা, উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রা। অথচ বিরোধী দলের একটি অংশ গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ভুলে আওয়ামী ধারার নেতিবাচক ও সংঘাতমুখী রাজনীতিতে ফিরে যাচ্ছে। এটি অত্যন্ত দুঃখজনক।”
তিনি বলেন, গণতন্ত্রে বিরোধী দলের দাবি জানানোর অধিকার যেমন রয়েছে, তেমনি নির্বাচিত সরকারেরও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনের অধিকার ও বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কোনো রাজনৈতিক দল নিজেদের অবস্থানকেই একমাত্র জনগণের রায় হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে না। জনগণের রায়কে সম্মান করা এবং সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা গণতান্ত্রিক রাজনীতির অপরিহার্য শর্ত।
তিনি বলেন, “বিরোধী দল সরকারের ভুলত্রুটি ধরিয়ে দিক, জনস্বার্থে বিকল্প প্রস্তাব দিক, সংসদে ও রাজপথে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করুক। কিন্তু গণদুর্ভোগ সৃষ্টি করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের চেষ্টা থেকে বিরত থাকুক। গণতন্ত্র মানে শুধু দাবি আদায়ের আন্দোলন নয়, জাতীয় স্বার্থে দায়িত্বশীল আচরণও।”
তিনি আরও বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী করা, অর্থনৈতিক পুনর্গঠন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং জনগণের জীবনমান উন্নয়নে সব রাজনৈতিক দলের সহযোগিতা প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে দেশ পুনর্গঠনের যে কার্যক্রম শুরু হয়েছে, তাতে বিরোধী দলগুলোরও ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে
হাসপাতাল নির্মাণ প্রসঙ্গে এমরান সালেহ প্রিন্স বলেন, “জনগণের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি আমি ভুলিনি, ভুলবও না। নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, জনগণের প্রতি আমার দায়বদ্ধতা ও ভালোবাসা অপরিবর্তিত রয়েছে। আমি নির্বাচনের আগে প্রতি ইউনিয়নে একটি করে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকার করেছিলাম। আজ ধুরাইল ইউনিয়নে হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের মধ্য দিয়ে সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নের কার্যক্রম শুরু হলো। পর্যায়ক্রমে হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার প্রতিটি ইউনিয়নে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হবে।”
তিনি বলেন, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষকে সাধারণ চিকিৎসার জন্যও অনেক সময় উপজেলা বা জেলা সদরে যেতে হয়। এতে অর্থ ও সময়ের অপচয় হয় এবং দরিদ্র মানুষ দুর্ভোগের শিকার হন। ইউনিয়ন পর্যায়ে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হলে গ্রামের মানুষ নিজ এলাকায় চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি স্থানীয় কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্বারোপ করে তিনি বলেন, “আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, স্থানীয় অর্থনীতি গতিশীল হবে এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নত হবে। একটি হাসপাতাল শুধু চিকিৎসাসেবা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়, এটি একটি এলাকার আর্থসামাজিক উন্নয়নেরও কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।”
তিনি বলেন, “আমরা কথার রাজনীতি নয়, কাজের রাজনীতিতে বিশ্বাস করি। জনগণের স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, যোগাযোগব্যবস্থা ও কর্মসংস্থানের উন্নয়নের মাধ্যমেই গণঅভ্যুত্থানের প্রকৃত আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে চাই। জনগণ এখন রাজনৈতিক সংঘাত নয়, উন্নয়নের সুফল দেখতে চায়।”
তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার পরিবর্তে গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে হবে। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা হোক নীতি, আদর্শ, কর্মসূচি ও জনকল্যাণের ভিত্তিতে। জাতীয় স্বার্থে মতপার্থক্য থাকবে, কিন্তু দেশ পুনর্গঠন ও জনগণের কল্যাণের প্রশ্নে সবাইকে দায়িত্বশীল হতে হবে।
তিনি ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে সকলকে সতর্ক থাকার আহবান জানিয়ে বলেন, ফ্যাসিস্টদের পুনর্বাসনে যারাই সহযোগিতা করবে , তাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে ।
৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে হাসপাতাল নির্মাণ, সৃষ্টি হবে নতুন কর্মসংস্থান
উল্লেখ্য, বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট–ধোবাউড়া) আসনে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী হিসেবে সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স নির্বাচনী এলাকার প্রতিটি ইউনিয়নে একটি করে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। নির্বাচনে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জিত না হলেও তিনি জনগণের কাছে দেওয়া সেই প্রতিশ্রুতি ভুলে যাননি। বরং নির্বাচনের পরও জনকল্যাণমূলক কার্যক্রম অব্যাহত রেখে প্রতি ইউনিয়নে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ বাস্তবায়ন শুরু করেছেন।
সমন্বিত গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি (আইআরডিপি)-এর অর্থায়নে এজেকেএস ফাউন্ডেশন ও সোহাগ ট্রেডার্স কনসোর্টিয়ামের উদ্যোগে প্রতিটি ইউনিয়নে ১০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল নির্মাণের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
ধুরাইল ইউনিয়নের উত্তর রামনগর (বনপাড়া) এলাকায় ৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিতব্য এই প্রান্তিক হাসপাতালের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
হাসপাতালটি চালু হলে স্থানীয় পর্যায়ে ২৩ জনের সরাসরি স্থায়ী কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। পাশাপাশি অস্থায়ীভাবে সেবা খাতে আরও অর্ধশতাধিক মানুষের কর্মসংস্থান এবং হাসপাতালকেন্দ্রিক ব্যবসা-বাণিজ্যের নতুন সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদিকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের চিকিৎসাসেবা সহজলভ্য হবে, অন্যদিকে স্থানীয় অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ধুরাইল ইউনিয়ন হাসপাতালের নির্মাণকাজ শুরুর মধ্য দিয়ে হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়ার প্রতিটি ইউনিয়নে হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার নির্বাচনী অঙ্গীকার বাস্তবায়নের নতুন যাত্রা শুরু হলো।
পূর্ব রামনগর প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ধুরাইল ইউনিয়ন বিএনপির আহবায়ক প্রভাষক মাসুম বিল্লাহর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসমাবেশে অন্যান্যের মধ্যে হালুয়াঘাট উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক আসলাম মিয়া আবুল , সদস্য সচিব আবু হাসনাত বদরুল কবির , আইআরডিপির এপিডি কুতুবুল আলম, সোহাগ কনস্ট্রাকশনের চেয়ারম্যান আকিকুল ইসলাম সোহাগ , ইউনিয়ন বিএনপি নেতা শহিদুল্লাহ , মোস্তফা মাস্টার , এমদাদ মেম্বার , আরিফ রব্বানী প্রমুখ ।