ময়মনসিংহ জেলাজুড়ে অত্যন্ত আনন্দ-উদ্দীপনা, ভাবগাম্ভীর্য ও শারদীয় আমেজের মধ্য দিয়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। পূজা মণ্ডপগুলোতে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। জেলা শহর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মণ্ডপগুলোতে পূজা, আরতি ও সান্ধ্যকালীন প্রার্থনায় মুখরিত হয়ে উঠেছে চারপাশ।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের তথ্য মতে, এ বছর ময়মনসিংহের ১৩টি উপজেলা ও সিটি কর্পোরেশন এলাকায় সাড়ে ৮ শতাধিক মণ্ডপে দুর্গাপূজা আয়োজিত হচ্ছে। উৎসবকে কেন্দ্র করে প্রতিটি মণ্ডপ আলোকসজ্জা ও দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জায় সাজিয়ে তোলা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে এবং সার্বিক শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে জেলা পুলিশ ও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে নিচ্ছিন্দ্র ও বহুস্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা।
পূজার সার্বিক পরিবেশ ও ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য নিয়ে মণ্ডপের প্রধান পুরোহিত পণ্ডিত শুভাশিস চক্রবর্তী বলেন, “শাস্ত্রীয় নিয়ম ও রীতিনীতি মেনে দেবীর আবাহন থেকে শুরু করে প্রতিটি পূজা-অর্চনা নিখুঁতভাবে সম্পন্ন করা হচ্ছে। বিশ্বশান্তি, দেশের সমৃদ্ধি এবং সকল মানুষের কল্যাণ কামনায় মা দুর্গার চরণে পুষ্পাঞ্জলি ও বিশেষ প্রার্থনা নিবেদন করছেন ভক্তরা।”
মণ্ডপের ব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তা আয়োজন নিয়ে পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি সুশান্ত সাহা বলেন, “প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সার্বিক সহযোগিতায় আমরা অত্যন্ত সুন্দর ও আনন্দঘন পরিবেশে পূজা উদযাপন করছি। ভক্তদের স্বাচ্ছন্দ্যে দর্শন ও অঞ্জলি প্রদানের জন্য নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবক দল সার্বক্ষণিক নিয়োজিত রয়েছে। সর্বস্তরের মানুষের উপচে পড়া উপস্থিতি প্রমাণ করে ময়মনসিংহ সবসময় সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ।”
মণ্ডপে আসা দর্শনার্থীদের মাঝেও দেখা গেছে সীমাহীন উচ্ছ্বাস; পরিবার নিয়ে আসা দর্শনার্থী অলোক রায় জানান, “প্রতিবছরই আমরা পূজার জন্য অপেক্ষা করি। মণ্ডপের সাজসজ্জা ও আবহ খুব সুন্দর লাগছে, পরিবার নিয়ে ঘুরে খুবই আনন্দ পাচ্ছি,” এবং অন্য এক দর্শনার্থী সুচরিতা দাস বলেন, “সব ধর্ম ও বর্ণের মানুষের সমাগমে মণ্ডপগুলো যেন মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। এত সুন্দর ও নিরাপদ পরিবেশে পূজা উপভোগ করতে পেরে আমরা ভীষণ আনন্দিত।”
পূজার সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন ময়মনসিংহ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন ও অর্থ) মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। তিনি জানান, “ময়মনসিংহ অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য জেলা। অত্যন্ত ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা যেন উদযাপিত হতে পারে, সেজন্য জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। আমরা প্রতিটি পূজা মণ্ডপকে বিশেষ নজরদারির আওতায় এনেছি।
গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর মণ্ডপগুলোতে পোশাকধারী পুলিশের পাশাপাশি সাদা পোশাকে অতিরিক্ত পুলিশ সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।” তিনি আরও বলেন, “পূজা চলাকালীন যেকোনো জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের বিশেষ টহল দল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স প্রস্তুত রয়েছে। পাশাপাশি মণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন ও নিজস্ব স্বেচ্ছাসেবী সদস্য রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। ময়মনসিংহে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অক্ষুণ্ণ রেখে অত্যন্ত উৎসবমুখর পরিবেশে সবাই যেন পূজা উদযাপন করতে পারেন, জেলা পুলিশ সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।”
উৎসবের প্রতিটি দিনেই মণ্ডপগুলোতে স্থানীয় সনাতন ধর্মাবলম্বী ছাড়াও বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণভিত্তিক সর্বস্তরের মানুষের উপস্থিতি দেখা গেছে, যা আবহমান বাংলার সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্ববোধের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।