সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি যুবক নজরুল ইসলাম (২৫) ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার সুলতানপুর ইউনিয়নের বিরামপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর মৃত্যুর খবর জানার পর পরিবারে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। এদিকে, ভাতিজার মৃত্যুর খবর শুনে হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তাঁর ফুফু আবেদা বেগম (৬৫) মারা গেছেন বলে জানিয়েছে পরিবার।
পরিবারের অভিযোগ, গত ১৪ অক্টোবর সৌদি আরবের মক্কা অঞ্চলে নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হলেও তাঁরা আগে থেকে এ বিষয়ে কিছু জানতেন না। গণমাধ্যমের খবর থেকে তাঁরা মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়টি জানতে পারেন। এখন একমাত্র উপার্জনক্ষম সন্তানকে হারিয়ে শোকের পাশাপাশি আর্থিক অনিশ্চয়তায় পড়েছে পরিবারটি। তাঁরা নজরুলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।
নজরুল ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের আবদুল বাছির ও রেহেনা বেগম দম্পতির চার সন্তানের মধ্যে সবার বড়। পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করতে ২০২২ সালে সাত লাখ টাকা ঋণ করে তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমান। সেখানে মক্কার মসজিদুল হারামের পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ পেয়েছিলেন বলে জানিয়েছেন তাঁর বাবা।
আবদুল বাছিরের ভাষ্য, সৌদি আরবে যাওয়ার সাত-আট মাস পর থেকে ছেলের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে একদিন নজরুল কারাগার থেকে ফোন করে তাঁকে বন্দি থাকার কথা জানান। তবে কী অভিযোগে তাঁকে আটক করা হয়েছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত কিছু বলেননি।
পরিবারের দাবি, প্রায় তিন বছর তিন মাস কারাগারে থাকার পর গত ১১ অক্টোবর নজরুল সর্বশেষ বাবার সঙ্গে কথা বলেন। তখন তিনি সমস্যার মধ্যে থাকার কথা জানিয়েছিলেন। এর কয়েক দিন পর, ১৪ অক্টোবর তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানতে পারেন স্বজনেরা।
আইনি সহায়তা নিয়ে পরিবারের প্রশ্ন
নজরুলের বাবা আবদুল বাছির বলেন, ছেলের মৃত্যুর খবর পাওয়ার পর থেকে তাঁদের বাড়িতে কান্নার রোল চলছে। ছেলেকে হারানোর শোকের মধ্যে তাঁর বোন আবেদা বেগমও মারা গেছেন। ঋণ করে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলেন, কিন্তু এখন ছেলে ও বোন—দুজনকেই হারিয়ে তিনি দিশাহারা।
তিনি অভিযোগ করেন, নজরুল কারাগারে থাকার সময় বাংলাদেশ কনস্যুলেটের কেউ তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন কি না, তা জানতে চেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁর জানা মতে, ছেলে কোনো সহায়তা পাওয়ার কথা জানায়নি।
আবদুল বাছিরের প্রশ্ন, নজরুলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য আইনজীবী নিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়েছিল কি না এবং বাংলাদেশ কনস্যুলেট তাঁর মামলার বিষয়ে কী ভূমিকা রেখেছিল। তিনি সরকারের কাছে ছেলের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি বিদেশে আটক বাংলাদেশি নাগরিকদের আইনি সহায়তা ও খোঁজখবর নিশ্চিত করার দাবি জানান।
নজরুলের মা-ও ছেলের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ নিয়ে আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁর দাবি, অভিযোগটি সঠিক নয় এবং সৌদি আরবে বাংলাদেশি মিশন থেকে তাঁরা প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পাননি। তিনি ছেলের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানান।
তবে নজরুলের মামলায় কী ধরনের আইনি সহায়তা দেওয়া হয়েছিল, তাঁর পক্ষে আইনজীবী ছিলেন কি না এবং কনস্যুলেটের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ হয়েছিল কি না—এসব বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের বিষয়ে সরকারের বক্তব্য
সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঘোষণার বরাতে আন্তর্জাতিক ও বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, ১৪ অক্টোবর মক্কা অঞ্চলে দুই বাংলাদেশি নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে একটি মসজিদে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগে আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে বাংলাদেশ সরকার ও সৌদি আরবে বাংলাদেশের মিশনকে এ বিষয়ে জানানো হয়নি। ঘটনার বিস্তারিত, বিচারিক প্রক্রিয়া এবং আগাম অবহিত না করার কারণ জানতে সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তথ্য চাওয়া হয়েছে।
এ ঘটনায় নজরুলের পরিবারের উদ্বেগের পাশাপাশি বিদেশে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত বাংলাদেশি নাগরিকদের ক্ষেত্রে কনস্যুলার সহায়তা, আইনি প্রতিনিধিত্ব এবং পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগের বিষয়গুলোও সামনে এসেছে।
মরদেহ ফেরাতে সরকারের সহযোগিতা চায় পরিবার
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক মো. আবু সাঈদ জানিয়েছেন, মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে তাঁদের কাছে সরকারের কোনো নির্দেশনা আসেনি। মরদেহ দেশে ফিরলে পরিবারকে সহায়তা করা হবে বলে তিনি জানান।
নজরুলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার খবরে বিরামপুর গ্রামে শোকের পরিবেশ বিরাজ করছে। স্বজন ও প্রতিবেশীরা শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়াচ্ছেন। পরিবারের এখন একটাই প্রত্যাশা—সন্তানের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে এনে তাঁদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।