শরতের নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা, সাগরের বুকে ঢেউয়ের অবিরাম নৃত্য আর বালুকাবেলায় মানুষের কোলাহল সব মিলিয়ে উৎসবের আগাম রঙে সেজেছে পর্যটন নগরী কক্সবাজার। শারদীয় দুর্গোৎসবের আবহে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে এখন সেই আনন্দেরই বিচিত্র আয়োজন পর্যটকদের পদভারে কানায় কানায় পরিপূর্ণ। শারদীয় দুর্গাপূজার টানা ৫ দিনের ছুটিতে বাংলাদেশের প্রধান পর্যটন নগরী কক্সবাজারে পর্যটকদের ঢল নেমেছে, যার ফলে অনেকদিন পর স্থানীয় পর্যটন শিল্প ব্যাপক চাঙ্গা হয়ে উঠেছে।

পর্যটন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা, এবারের টানা অবকাশে কক্সবাজারে প্রায় ৮ লাখ পর্যটকের সমাগম ঘটবে। এই বিপুল জনস্রোতের কারণে স্থবির হয়ে পড়া স্থানীয় পর্যটন শিল্পে নতুন জোয়ার এসেছে এবং পর্যটন নির্ভর অর্থনীতিতে এক শক্তিশালী গতি সঞ্চার হয়েছে।
ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর হিসাব মতে, পূেঁজার টানা ছুটিতে আবাসন, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতসহ সামগ্রিক পর্যটন শিল্পে এবার ৫শত কোটি টাকার রেকর্ড বাণিজ্যের সম্ভাবনা উঁকি দিচ্ছে। ইতোমধ্যে শহরের সাড়ে পাঁচ শতাধিক হোটেল মোটেল ও রিসোর্টের প্রায় ৯০ শতাংশেরও বেশি কক্ষ আগাম সংরক্ষিত হয়ে গেছে। শুধু বড় লজিস্টিকস চেইনই নয়, বরং সৈকতের কিটকট (ছাতা), বিচ বাইক, ক্ষুদ্র শুঁটকি ও ঝিনুক ব্যবসায়ী এবং ফটোগ্রাফারদের দৈনিক আয়ও কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

বঙ্গোপসাগরের নীল জলরাশি আর ঢেউয়ের গর্জন উপভোগ করতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ছুটে আসছেন ভ্রমণপিপাসুরা। সৈকতের বালুকাবেলায় শিশু কিশোরদের উচ্ছ্বাস, পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরতে আসা মানুষের আনন্দ আর দলবেঁধে তরুণ তরুণীদের বিচরণে পর্যটননগরী ফিরে পেয়েছে প্রাণচাঞ্চল্য। পরিবার, বন্ধু কিংবা প্রিয়জনকে সঙ্গে নিয়ে আসা মানুষজন মেতে উঠেছেন সমুদ্রস্নান, ঘোরাঘুরি ও
স্মৃতিময় মুহূর্ত তৈরিতে। সৈকতের বালুকাবেলায় আনন্দ—উচ্ছ্বাসের পাশাপাশি জমে উঠেছে ছবি তোলা, সমুদ্রস্নান আর অবকাশযাপনের আয়োজন।

স্থানীয় অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎসবের এই সপ্তাতেই কক্সবাজারে পর্যটন খাতে গড়ে ৫শকোটি টাকার লেনদেন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। , কক্সবাজারে পর্যটকদের এই ঢল পর্যটন খাতের জন্য একটি শুভ লক্ষণ। তবে দীর্ঘমেয়াদে টেকসই পর্যটন নিশ্চিত করতে হলে আমাদের অবকাঠামো উন্নয়ন, পরিবেশ সংরক্ষণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সমন্বয়ের বিষয়ে আরো বেশি মনোযোগ দিতে হবে।

কক্সবাজার আইকনিক রেলওয়ে স্টেশনের দায়িত্বে থাকা স্টেশন মাস্টার মোশাররফ হোসেন জানান, কক্সবাজারে যাত্রী চাপ সামলাতে রেলওয়ের বিশেষ ট্রেন এই ছুটিতে অতিরিক্ত যাত্রীদের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। ঢাকা কক্সবাজার রুটে নিয়মিত চলাচলকারী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ও ট্যুরিস্ট এক্সপ্রেস ছাড়াও ২০, ২৩ এবং ২৪ অক্টোবর বিশেষ ট্রেন পরিচালনা করা হচ্ছে। বাড়তি চাহিদার কথা মাথায় রেখেই রেল প্রশাসন এই বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে।

সোমবার(১৯ অক্টোবর) সরজমিনে দেখা যায়, টানা ছুটির কারণে কক্সবাজারের হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টগুলোর প্রায় শতভাগ কক্ষ আগে থেকেই বুকড হয়ে গেছে। পর্যটকদের এই উপচে পড়া ভিড়ে হাসি ফুটেছে পর্যটন ব্যবসায়ী, ট্যুর গাইড, ফটোগ্রাফার এবং বিচ বাইক চালকদের মুখে। হোটেল রেস্তোরাঁ থেকে শুরু করে শুঁটকি ও শামুক ঝিনুকের দোকানগুলোতেও এখন জমজমাট বেচাকেনা চলছে। শুধু সমুদ্রসৈকত নয়, বিনোদনপিয়াসী মানুষের আনাগোনা বেড়েছে কক্সবাজারের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানেও।
ইনানী পাথুরে সৈকত, দৃষ্টিনন্দন মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি ঝরণা, দরিয়ানগর ও টেকনাফ রুটে পর্যটকদের ভিড় লক্ষণীয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এবং ঝলমলে রোদ থাকায় পরিবার পরিজন নিয়ে ঘুরে বেড়ানোর আনন্দ দ্বিগুণ হয়েছে পর্যটকদের জন্য। মেরিন ড্রাইভ ধরে কক্সবাজার থেকে টেকনাফ পর্যন্ত ৮০ কিলোমিটারের বেশি পথ চলাচলের সুযোগ থাকায় পর্যটকরা এই রুটকে বরাবরের চেয়ে বেশি পছন্দ করছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ট্যুর অপারেটররা।

রাজধানী ঢাকার মিরপুর থেকে সপরিবারে ছুটে আসা পর্যটক আলমগীর হোসেন জানান, সাপ্তাহিক ছুটিতে সমুদ্রের বাতাস নেওয়ার সুযোগটা তারা হাতছাড়া করতে চাননি। সেটা পরিবারের সঙ্গে হলে আনন্দটা হয় আরও বেশি। ব্যস্ত জীবনে সব সময় পরিবারকে নিয়ে এভাবে সময় কাটানোর সুযোগ হয় না। তাই ছুটি পেয়ে কক্সবাজারে চলে এসেছি। সৈকতের চাদিকে মানুষ আর মানুষ সবার সাথে ভীষণ ভালো লাগছে। রাত পর্যন্ত বীচে থাকি নিরাপত্তা খুবই ভালো।
দিনাজপুর থেকে আসা পর্যটক পারভীন আক্তার বলেন, মহেশখালী, ইনানী বিচ ও হিমছড়িসহ আশপাশের দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখার পরিকল্পনা রয়েছে। গরম কিছুটা বেশি হলেও পরিবারের সবাই মিলে আনন্দ করছি। সব মিলিয়ে কক্সবাজার ভ্রমণ আমাদের জন্য দারুণ আনন্দের।

হোটেল প্রাসাদ প্যারাডাইসের গ্রুপ জেনারেল ম্যানেজার লোকমান হোসাইন অপু জানান, এবার দুর্গাপূজা উপলক্ষে টানা ছুটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়ছে। প্রতিদিন হোটেলে পর্যটকদের বেশ ভালো চাপ রয়েছে। আশা করছি, আগামী দিনগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে এবং পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটবে।

কক্সবাজার হোটেল মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার বলেন, টানা ছুটিতে কক্সবাজারে পর্যটকের আগমন শুরু হয়েছে। ভালো মানের হোটেল—রিসোর্টের বেশির ভাগ কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, পূজার ছুটিতে ৮ লাখের মত পর্যটক কক্সবাজারে আসবেন। এর মধ্যে প্রতিমা বিসর্জনের দিনই দুই লাখের বেশি মানুষ আসতে পারেন বলে ধারণা করছেন।

কক্সবাজার ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ সুপার নিশাত এঞ্জেলা বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে টানা ছুটির সুযোগে কক্সবাজারে পর্যটকদের বিপুল সমাগমের আশা করা হচ্ছে। যানজট ও সড়ক দুর্ঘটনা এড়াতে কক্সবাজার সদর থানা, টেকনাফ, রামু ও উখিয়া পুলিশ স্টেশন এলাকায় বিশেষ ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট চালু করা হয়েছে। বপুল সংখ্যক পর্যটকের আগমনকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসন ও আইন—শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের দায়িত্বপ্রাপ্ত সহকারী কমিশনার ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. মাহমুদুর রহমান সায়েম, পর্যটকদের নিরাপত্তা ও পর্যটন শিল্পের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। হোটেল—রেস্তোরাঁ ও অন্যান্য সেবা খাতে অতিরিক্ত মূল্য আদায় এবং যেকোনো ধরনের হয়রানি ও অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রোধ করতে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালত দায়িত্ব পালন করছে।