কুমিল্লার লাকসামে ছয়তলা ভবন থাকা সত্ত্বেও স্থাপনাবিহীন বাড়ির দাগ উল্লেখ করে তথ্য এবং সঠিক মূল্য গোপন রেখে দলিল সম্পাদনে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপজেলার কান্দিরপাড় ইউনিয়নের তুতিগঙ্গা গ্রামের হাসমত আলীর ছেলে মকবুল হোসেনের বিরুদ্ধে দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে জমির শ্রেণি, সঠিক তথ্য এবং প্রকৃত মূল্য গোপন রেখে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এই ঘটনায় অতি সম্প্রতি লাকসাম পৌরসভার উত্তর লাকসাম এলাকার মো. সাইফুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন।
লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিস, দুদকে দায়ের করা অভিযোগ এবং দলিলের নথি সূত্রে জানা গেছে, পাশবর্তী মনোহরগঞ্জ উপজেলার উত্তরহাওলা গ্রামের মো. রুহুল আমিনের মেয়ে, নাঙ্গলকোটের আশীরপাড়ের ওয়াহিদ সোহাগ মজুমদারের স্ত্রী উম্মে তামান্নার মালিকানাধীন লাকসাম মৌজার ধোপা পুকুর পাড় এলাকায় ৫২ লাখ টাকায় মকবুল হোসেনের নিকট ছাফকবলা দলিলমূলে বিক্রি করেন। যা চলতি বছর ৩০ আগষ্ট লাকসাম সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে দলিল সম্পাদিত হয়। এতে সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য ১ কোটি টাকা গোপন রেখে মাত্র ৫২ লাখ টাকা উল্লেখ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে ক্রেতা ও বিক্রেতার যোগসাজসে তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দিয়েছেন ক্রেতা।
অভিযোগকারী মো. সাইফুল ইসলাম দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর লিখিত অভিযোগে জানান, দলিল নিবন্ধনে সঠিক তথ্য এবং জমি ও স্থাপনার প্রকৃত মূল্য গোপন, জমির প্রকৃত শ্রেণি, ভবনের বিবরণ অত্যন্ত সুকৌশলে গোপন রেখে সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেন দলিল দাতা ও গ্রহীতা। সঠিক তথ্য উদঘাটন এবং রাজস্ব ফাঁকির বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান অভিযোগকারী।
অভিযোগ সূত্রে আরও জানা যায়, মকবুল হোসেনের ক্রয়কৃত জমিতে বর্তমানে ছয়তলা যে ভবনটি রয়েছে, ২০২৩ সালে এটির নির্মাণ কাজ শেষ হয়। কিন্তু জমি রেজিস্ট্রি দলিলে ভবনটির বিবরণ উল্লেখ না করে স্থাপনাবিহীন বাড়ি উল্লেখ করা হয়। তদন্ত সাপেক্ষে দায়ী ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান অভিযোগকারী।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে দলিল গ্রহীতা মকবুল হোসেন জানান, আমি দীর্ঘ বছর ধরে প্রবাসে থাকি। এসব আইন-কানুন সম্পর্কে আমি অবগত নই। দলিল লেখক যেভাবে বুঝিয়েছেন, আমি সেভাবে সম্মতি দিয়েছি। এছাড়াও আরো দু’জন ক্রেতা রয়েছেন।
দলিল লেখক মো. শফিকুর ইসলাম দাবি করেন, দলিল গ্রহীতা সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেননি। বরং সর্বোচ্চ রাজস্ব পরিশোধ করেছেন। তিনি বলেন, “আমার কাজ দলিল করা, তাই করেছি। জায়গায় গিয়ে জমির শ্রেণি যাচাই করা আমার কাজ নয়।”
এদিকে দলিল লেখক হিসেবে তাঁর দায়িত্ব ও সংশ্লিষ্ট দলিল নিবন্ধনে তথ্য যাচাইয়ের বিষয়টি নিয়েও সচেতনমহলে প্রশ্ন ওঠেছে।
লাকসাম উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মো. আহসান উল্লাহ মজুমদার বলেন, দাতা-গ্রহীতার দেয়া তথ্য ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সরবরাহ সাপেক্ষে একজন দলিল লেখক তাঁর লেখার কাজ সম্পন্ন করেন। সাব রেজিস্ট্রার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাইয়ে সঠিক পেলে দলিল রেজিস্ট্রি করেন। কিন্তু পক্ষদ্বয় কোনো কিছু গোপন করলে সম্পূর্ণ দায়ভার তাঁদের। এখানে দলিল লেখকের কিছুই করার থাকে না।
এই ব্যাপারে লাকসাম উপজেলা সাব রেজিস্ট্রার সাজ্জাদুল কবির বলেন, খতিয়ান, নামজারী জমা-খারিজ, খাজনা বা দাখিলা অনুযায়ী সম্পত্তির শ্রেণিসহ আনুষাঙ্গিক কাগজপত্র সঠিক এবং কারো কোনো রকম আপত্তি না থাকলে আমার রেজিস্ট্রি সম্পাদনে বাধা নেই। তবে সরকারের রাজস্ব ফাঁকি দেয়ার জন্য সঠিক ও প্রকৃত মূল্য বা তথ্য গোপন করা হলে তদন্ত পূর্বক আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তিনি বলেন, বিষয়টি সম্পর্কে আমি অবহিত হয়েছি। এটি খতিয়ে দেখা হবে। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট দলিল লেখককে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা এবং সঠিক তথ্য ও প্রকৃত মূল্য গোপন করে রেজিস্ট্রি হয়ে থাকলে সরকারের প্রকৃত রাজস্ব আদায়ের ব্যবস্থা নেয়ার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এই ক্ষেত্রে সকল কিছুর উর্ধ্বে সরকারের স্বার্থ সংরক্ষণ করা আমার দায়িত্ব।