একটি নামের আড়ালে কখনো কখনো লুকিয়ে থাকে একটি প্রাচীন জনপদের জন্মকথা, বাস্তুচ্যুত মানুষের দীর্ঘশ্বাস, ঔপনিবেশিক সময়ের রক্তক্ষয়ী ইতিহাস আর এক বিস্মৃত কীর্তির করুণ আখ্যান। প্রমত্তা নদী হয়তো কেড়ে নিয়েছে তাঁর দৃশ্যমান স্মৃতিচিহ্ন, সময়ের নিষ্ঠুর স্রোত মুছে দিয়েছে বহু পদচিহ্ন কিন্তু ইতিহাস থেকে মুছে দিতে পারেনি একটি নাম ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স। আজকের এই আধুনিক জনপদের নামের গভীরেই অমর হয়ে আছে তাঁরই পুণ্যস্মৃতি।
হলুদ ফুলের স্মৃতিবিজড়িত আদি ‘প্যানোয়া’ আর দুর্গম অরণ্যের ‘পালঙ্কী’র বুক চিরে আজ যে বিশ্বখ্যাত কক্সবাজার সগর্বে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, তার নেপথ্যে লুকিয়ে আছে এক ব্রিটিশ ত্রাতার মহাকাব্যিক আত্মত্যাগের করুণ আখ্যান। আজকের বিশ্বখ্যাত পর্যটন নগরী কক্সবাজারের নামের গভীরে লুকিয়ে আছে তাঁরই ইতিহাস। অথচ যে মানুষটির নাম একটি জনপদের পরিচয়ে অমর, তাঁর নিজের স্মৃতিচিহ্নই আজ অনেকটা বিস্মৃতির অতলে। কোথায় তাঁর সমাধি, কীভাবে হারিয়ে গেল সেই শেষ চিহ্ন এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে ইতিহাস ও জনশ্রুতির মাঝখানে খুলে যায় এক বিস্ময়কর অধ্যায়।
আজ থেকে প্রায় আড়াই শতাব্দী পূর্বে, দুর্গম অরণ্যবেষ্টিত পালংকির বুকে এক ত্রাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির মানবতাবাদী সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স। তিনি রামু ফতেখাঁরকুলের এই নিভৃত বাংলোতে বসেই বুনেছিলেন এক জনপদের পুনরুত্থানের স্বপ্ন। কিন্তু নিয়তির নির্মম পরিহাসে এই মাটির বুকেই মাত্র ৩৯ বছর বয়সে বুনো ম্যালেরিয়ার থাবা অকালে নিভে যায় এই মহানায়কের জীবনপ্রদীপ, যার কৃতজ্ঞতা স্বরূপ গড়ে ওঠা ‘কক্স সাহেবের বাজার’ আজ কালের বিবর্তনে বিশ্বনন্দিত এক পর্যটন নগরীর নাম “কক্সবাজার”।
জনশ্রুতি বনাম ইতিহাস
কক্সবাজারের স্থানীয় বিভিন্ন গোত্রের মানুষের মধ্যে দীর্ঘযুগ ধরে নাকি একটি জনশ্রুতি প্রচলিত হিরাম কক্সের সমাধি ছিল বাকখালী নদীর তীরবর্তী এলাকায়। নদীভাঙনে সেই সমাধি ও আশপাশের স্মৃতিচিহ্ন বিলীন হয়ে গেছে বলেও স্থানীয়ভাবে বলা হয়। কারণ লিখিত ইতিহাসের বাইরে একটি জনপদের স্মৃতি টিকে আছে মানুষের মুখে মুখে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা এসব কাহিনির মধ্যে কখনো বাস্তব ইতিহাসের সূত্র লুকিয়ে থাকে। তাই জনশ্রুতিকে অস্বীকার না করে সেটিকে দলিল, পুরোনো মানচিত্র, সরকারি নথি, প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান ও স্থানীয় সাক্ষ্যের মাধ্যমে যাচাই করাই ইতিহাস অনুসন্ধানের সঠিক পথ।
পালংকী থেকে কক্সবাজার
এই অঞ্চলের দুটি ঐতিহাসিক প্রাচীনতম নাম ছিল প্যানোয়া যার আক্ষরিক অর্থ হলো হলুদ ফুল। সমুদ্রকূলবর্তী বিস্তীর্ণ জনপদ ও তার আশপাশের পাহাড়ি এলাকাগুলো বুনো হলুদ ফুলে ঝকমক করত। সেই প্রাকৃতিক রূপ থেকেই আদি অধিবাসীরা এই অঞ্চলের নাম দিয়েছিলেন প্যানোয়া। পরবর্তী সময়ে এই অঞ্চলটি পালঙ্কী বা পালংকি নামে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। কক্সবাজারের প্রাচীন নাম পালংকি। হিরাম কক্স পালংকি এলাকায় প্রতিষ্ঠা করেন একটি বাজার। প্রথমে বাজারটি “কক্স সাহেবের বাজার” নামে পরিচিত ছিল। পর্যায়ক্রমে কক্সবাজার নামের উৎপত্তি ঘটে।
স্থাপত্যশৈলী ও বর্তমান অবস্থান
ঐতিহাসিক এই বাংলোটি কক্সবাজার জেলা শহর থেকে প্রায় ২৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। রামু চৌমুহনী স্টেশন থেকে রামু মরিচ্যা আরাকান সড়ক ধরে মাত্র ২ কিলোমিটার দক্ষিণে গেলেই অফিসেরচর গ্রামে ছবুজের ছায়ায় অসংখ্য গাছ গাছালির মাঝেই সুন্দর পরিবেশে বাংলোটি। দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে বাইরে বসার জন্য রয়েছে দুটি বেঞ্চ। বাড়িটির অভ্যন্তরে ঢুকতেই চোখে পড়ে স্মৃতিফলক। মাটির ওপর থেকে প্রায় ২০ ফুট উঁচু চুন—সুরকি ও কংক্রিটের শক্ত দেয়াল, বড় বড় রাজকীয় কাঠের দরজা জানালা, বিশাল চওড়া বারান্দা এবং মাথার ওপরে লোহার শক্ত পাতের ওপর বসানো উঁচু টিনের ছাউনি তখনকার চমৎকার নির্মাণশৈলী। সেখানে ক্যাপ্টেন কক্স ও বাড়িটির ইতিহাস উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলোতে আছে ব্রিটিশ শাসনামলের একটি খাট,চেয়ার টেবিল। সড়কের পাশেই ক্যাপ্টেন কক্সের ছবিসহ বড় পরিচিতি সাইনবোর্ড টাঙানো রয়েছে।
কে এই ক্যাপ্টেন হিরাম কক্স
হিরাম কক্স (১৭৬০—১৭৯৯) ছিলেন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ও কূটনীতিক, জন্ম স্কটল্যান্ডে। বার্মা থেকে ফিরে হিরাম কক্স পালংকি অঞ্চলের প্রশাসনিক দায়িত্বে যুক্ত হন। তাঁর প্রধান কাজ ছিল আরাকান থেকে আসা উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসন। তৎকালীন সময়ে বর্মী রাজার নির্যাতনে প্রায় ত্রিশ হাজার আরাকানি এ অঞ্চলে পালিয়ে এলে কোম্পানি তাদের পুনর্বাসনের দায়িত্ব দেয় তাঁকে। রামুতে থেকে তিনি শরণার্থীদের বসতি গড়ার কাজ শুরু করেন এবং একটি বাজারের পরিকল্পনা করেন। কিন্তু কাজ শেষের আগেই ১৭৯৯ সালে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর স্মরণে গড়া বাজারই “কক্সের বাজার” আজকের কক্সবাজার।
কবর হারিয়েছে, নাম হারায়নি
আজ কক্সবাজারের রাস্তায় যে মানুষ হাঁটেন, যে পর্যটক সমুদ্রসৈকতে আসেন, যে ব্যবসায়ী এই শহরের অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত, এমনকি যে শিশু প্রথমবার‘কক্সবাজার’ শব্দটি উচ্চারণ করে তারাও অজান্তে বহন করছে প্রায় আড়াই শতাব্দী আগের এক মানুষের নাম। এটাই ইতিহাসের সবচেয়ে বিস্ময়কর প্রতিশোধ মানুষ হারিয়ে যায়, কিন্তু নাম থেকে যায়।
বিয়োগান্তক বিদায়
মাত্র ৩৯ বছর বয়সে তাঁর মৃত্যুসংবাদ পৌঁছেছিল দূর কলকাতায় অবস্থানরত সহধর্মিণী মেরি ফ্রেজারের কাছে। সঙ্গে ছিলেন তাঁদের একমাত্র পুত্র দশ বছরের হেনরি চেম্বার্স মারে কক্স। স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর সংবাদে শোকাহত মেরি ফ্রেজার নৌপথে ছুটে আসেন পালংকী তথা রামুর সেই কর্মভূমিতে। স্বামীকে শেষ বিদায় জানিয়ে মেরি ফ্রেজার হিরাম কক্সের লেখা বার্মা মিশনের অমূল্য নথি ও ব্যক্তিগত স্মৃতি সাথে করে নিয়ে যান। ১৭৯৯ সালের পুত্র হেনরিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি কলকাতায় ও পরে পুত্রকে নিয়ে চিরতরে ইংল্যান্ডে পাড়ি জমান মেরি ফ্রেজার।
অবহেলার কালিমোচন
ক্যাপ্টেন কক্সের বিদায় পরবর্তী সুদীর্ঘ প্রায় আড়াই শতাব্দী সময় চরম উপেক্ষা ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাটি জরাজীর্ণ ও পরিত্যক্ত অবয়ব ধারণ করেছিল। স্থানীয় পরিমণ্ডলে এটি কেবলই ‘জেলা পরিষদ ডাকবাংলো’ হিসেবে চরমভাবে অবমূল্যায়িত হয়ে এসেছে। সম্প্রতি রামু উপজেলা প্রশাসনের প্রত্যক্ষ তদারকিতে বাংলোটির আদি স্থাপত্যশৈলী অক্ষুণ্ণ রেখে সংস্কার করা হলেও, এর স্থায়ী দেখভালে এখনো এক অনভিপ্রেত উদাসীনতা দৃশ্যমান।
বুদ্ধিজীবীদের মতে, কক্সবাজারের ইতিহাসের এই অনন্য স্মারকটি বর্তমান ও আগামী প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করা পরম জরুরি। এখনো সময় আছে যথাযথ তদারকি ও পরম মমতায় এই প্রাচীনতম নিদর্শনটিকে রক্ষা করা গেলেই এর দীর্ঘদিনের অবহেলার কালিমোচন সম্ভব।
দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত এখন
ঐতিহাসিক এই বাংলোটি বর্তমানে পর্যটকদের পরিদর্শনের জন্য অবমুক্ত করা হয়েছে। বাংলোর অভ্যন্তরে পরম যত্নে ও নিখুঁতভাবে সংরক্ষিত রয়েছে ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের স্মৃতিবিজড়িত দুশত বছরেরও বেশী প্রাচীন কাঠের তৈরি রাজকীয় খাট, চেয়ার ও টেবিল। যদিও বহু বছরের অবহেলায় ছোটখাটো অনেক নথিপত্র নষ্ট হয়ে গেছে, তবে এই মূল আসবাবগুলো এখনও সুরক্ষিত আছে।
ক্যাপ্টেন হিরাম কক্সের এই বাংলোটি কেবল ইট—পাথরের কোনো সাধারণ স্থাপনা নয়, এটি কক্সবাজারের আদি শেকড় ও উৎপত্তির এক জীবন্ত মহাকাব্য। কালের নিষ্ঠুর গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়া এই স্মৃতিশালাটি আজো প্রতিটি ইটের কণিকায় ধারণ করে আছে এক মহান ব্রিটিশ কর্মকর্তার আত্মত্যাগ ও একটি বিশ্বখ্যাত পর্যটন নগরীর জন্মবেদনার করুণ ইতিহাস।
রামুর প্রবীণদের স্মৃতিতে হিরাম কক্স
ইতিহাস কেবল শুষ্ক কাগজের পাতায় বন্দি থাকে না, তা জীবন্ত হয়ে বেঁচে থাকে মানুষের মুখে মুখে। শতবর্ষের প্রাচীন জনপদ রামুর প্রবীণদের স্মৃতিকথায় আজও অমলিন হয়ে আছেন হিরাম কক্স এবং তাঁর স্মৃতিবিজড়িত কক্স সাহেবের বাজার।
স্মৃতির ঝাঁপি খুলে ৭৮ বছর বয়সী আবু সুলতান বলেন, শৈশব থেকেই পূর্বপুরুষদের মুখে হিরাম কক্সের গল্প শুনে আসছি। যাঁর নাম ধারণ করে আজকের এই বিশাল জনপদ তাঁর নিজের রেখে যাওয়া স্মৃতিচিহ্নগুলো সম্পর্কে আজ আমরা বড্ড উদাসীন। নতুন প্রজন্মের কাছে এই ইতিহাস পৌঁছে দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
রামুর ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির রূপটি ফুটিয়ে তোলেন ৮২ বছর বয়সী প্রবীণ অনিল বড়ুয়া। তিনি বলেন, আমাদের সময়ের বয়োজ্যেষ্ঠরা হিরাম কক্সের সমসাময়িক পালংকী ও এর আশপাশের অঞ্চলের লোকগাথা শোনাতেন। ইতিহাস তো কেবল বইয়ে থাকে না তা স্পন্দিত হয় মানুষের মুখের কথায়।
স্মৃতিময় সেই দিনগুলোর কথা স্মরণ করে ৭৫ বছর বয়সী প্রফুল্ল দাশ বলেন, আমাদের ছোটবেলায় কক্সবাজার নামটা আজকের মতো এত বৃহৎ পরিচিতি পায়নি। তখন সবার মুখে মুখে মুখরিত হতো ‘কক্স সাহেবের বাজার।
প্রবীণদের এই অমূল্য স্মৃতিচারণ মনে করিয়ে দেয়, শেকড়ের এই গৌরবময় ইতিহাসকে অবলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা আজ ভীষণ জরুরি।
গবেষক ও কবি কামরুল হাসান
তার সাথে আলাপকালে এক গভীর ঐতিহাসিক সত্য উন্মোচন করেন। তাঁর মতে, কক্সবাজারের নামের সঙ্গে হিরাম কক্সের সংযোগ কেবল একটি নামকরণের সাধারণ ঘটনা নয় এর পেছনে লুকিয়ে আছে প্রাচীন পালংকী জনপদ, আরাকান থেকে আসা বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং ঔপনিবেশিক আমলের এক জটিল প্রশাসনিক অধ্যায়। তিনি আক্ষেপ প্রকাশ করে বলেন, কক্স সাহেবের বাজার থেকে আজকের কক্সবাজার হয়ে ওঠার এই বিবর্তন আমাদের আঞ্চলিক ইতিহাসের এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মহাকাব্য। কিন্তু অত্যন্ত দুঃখজনক যে হিরাম কক্সের কর্মস্থল, অমূল্য স্মৃতিচিহ্ন কিংবা তাঁর কথিত সমাধিস্থল নিয়ে আজও কোনো প্রামাণ্য ও নিবিড় গবেষণা হয়নি। এই সত্যকে উন্মোচন করতে এখন লোকশ্রুতি এবং ঐতিহাসিক দলিল উভয় দিককে পাশাপাশি রেখে এক সুগভীর অনুসন্ধান চালানো বড্ড প্রয়োজন।
ইতিহাসপ্রেমী ও কৌতূহলী পাঠকদের জন্য
দুই শতাব্দীরও বেশি সময় পেরিয়ে রামুর সেই বাংলোটি আজও বহন করছে হিরাম কক্সের নিঃসঙ্গ দীর্ঘশ্বাস। কক্সবাজারের উজ্জ্বল সমুদ্রসৈকত যতই পর্যটকদের মাতোয়ারা করুক না কেন, এই মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা বেদনাবিধৌত ইতিহাস ও লন্ডনে ফেরা ভাঙা পরিবারের কান্না যুগে যুগে স্মরণ করিয়ে দেবে কক্সবাজার এর নামের পেছনের চিরন্তন আত্মত্যাগের অম্লমধুর ইতিহাস।