সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে করা মামলায় সাবেক দুই সেনা কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পাল এবং লেফটেন্যান্ট (অব.) কাজী গুলশান আরাকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এ মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তাঁদের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত।

সোমবার (১২ অক্টোবর) সন্ধ্যায় ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট দিদারুল আলম শুনানি শেষে এ আদেশ দেন। এর আগে তদন্ত কর্মকর্তা দুই আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেছিলেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ রিমান্ডের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
বনানী ডিওএইচএস থেকে গ্রেপ্তার

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, রোববার (১১ অক্টোবর) দিবাগত রাতে রাজধানীতে অভিযান চালিয়ে দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের পল্লবী জোনাল টিম এ অভিযান পরিচালনা করে। তাঁদের মধ্যে বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পালকে বনানী ডিওএইচএস এলাকার একটি বাসা থেকে রাত আড়াইটার দিকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পল্লবী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জালাল উদ্দিন জানান, ডিবির একজন পরিদর্শক বাদী হয়ে তাঁদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী আইন ও সাইবার নিরাপত্তা আইনে মামলা করেছেন।

এজাহারে যেসব অভিযোগ

মামলার এজাহারে অভিযোগ করা হয়েছে, দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তা ও তাঁদের সহযোগীরা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরকারবিরোধী প্রচারণা, তহবিল সংগ্রহ এবং সহিংসতায় উসকানিমূলক ডিজিটাল কনটেন্ট তৈরি ও প্রচারের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এজাহারে আরও দাবি করা হয়েছে, ‘ইউনিটি কেয়ার পাবলিক পার্লামেন্ট’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে তাঁরা সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) আজিজ আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং বিদেশে অবস্থানরত আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতেন। পুলিশের অভিযোগ, এ যোগাযোগের উদ্দেশ্য ছিল আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসন এবং রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকা।

‘কালআজকাল ডটকম’ নামে একটি পেজের মাধ্যমে সহিংসতা ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির উদ্দেশ্যে কনটেন্ট তৈরির অভিযোগও আনা হয়েছে। এ ছাড়া নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্যে অবৈধ অর্থায়ন এবং ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে সরকার ও বাংলাদেশের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রমূলক প্রচারণা চালানোর অভিযোগ রয়েছে।

এসব অভিযোগ মামলার এজাহার ও পুলিশের বক্তব্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে। আদালতে অভিযোগগুলোর সত্যতা এখনো প্রমাণিত হয়নি।

গুলশান আরার বিরুদ্ধে অতীতের রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার অভিযোগ

এজাহারে কাজী গুলশান আরার বিরুদ্ধে ২০১৮ সালের ২৭ নভেম্বর জাতীয় নির্বাচনের আগে দেড় শতাধিক অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার সঙ্গে গণভবনে গিয়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি প্রকাশ্যে সমর্থন ও আনুগত্য প্রকাশের অভিযোগ আনা হয়েছে।

এ ছাড়া ‘বঙ্গবন্ধু সেনা পরিষদ’ নামে একটি কমিটি গঠন এবং ওই সংগঠনের মাধ্যমে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়িয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগও রয়েছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আসামিদের বক্তব্য বা স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণের বিস্তারিত এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

রিমান্ডের পক্ষে রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি

মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ডিবির সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের পরিদর্শক শেখ বশির আহমেদ আদালতে সাত দিনের রিমান্ড আবেদন করেন।

আবেদনে বলা হয়, মামলার অন্য আসামিদের পরিচয় ও অবস্থান শনাক্ত করা, দেশি-বিদেশি ব্যক্তিদের সংশ্লিষ্টতা যাচাই, ডিজিটাল আলামত উদ্ধার এবং আসামিদের পরিচালিত অন্য কোনো ওয়েবসাইট বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজের সন্ধান পেতে তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।

রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ আদালতে দাবি করেন, আসামিরা সাবেক সরকারের নেতাকর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে দেশকে অস্থিতিশীল করার কর্মকাণ্ডে যুক্ত ছিলেন। তাঁদের যোগাযোগ, কথিত নাশকতামূলক পরিকল্পনা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিষয়ে তথ্য জানতে রিমান্ড প্রয়োজন বলে যুক্তি দেন তিনি।

রিমান্ডের বিরোধিতা আসামিপক্ষের

আসামিপক্ষের আইনজীবী আবদুল্লাহ আল মনসুর রিমান্ড আবেদন বাতিলের আবেদন জানিয়ে বলেন, বিজয় দেবাশীষ নারায়ণ পালের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি রিমান্ড আবেদনে স্পষ্ট করা হয়নি।

অন্যদিকে কাজী গুলশান আরার আইনজীবী মোহাম্মদ মশিউর রহমান বলেন, টক শোতে অংশ নিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার অভিযোগ আনা হলেও তাঁর মক্কেল ঠিক কী বক্তব্য দিয়েছেন এবং সেই বক্তব্যের সঙ্গে কথিত অপরাধের সম্পর্ক কী, তা আবেদনে পরিষ্কার করা হয়নি।

উভয় পক্ষের বক্তব্য শুনে আদালত সাত দিনের পরিবর্তে চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।

তদন্তের পরবর্তী ধাপ

আদালতের আদেশের পর দুই সাবেক সেনা কর্মকর্তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে তদন্তকারী সংস্থা। পুলিশ জানিয়েছে, ডিজিটাল আলামত, অন্য অভিযুক্তদের সংশ্লিষ্টতা এবং কথিত অর্থায়নের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ তদন্তের অংশ।

তবে মামলার অভিযোগ, পুলিশের দাবি এবং আসামিপক্ষের বক্তব্যের মধ্যে পার্থক্য বিবেচনায় রেখে তদন্তের ফলাফল ও পরবর্তী আদালতীয় কার্যক্রমের ওপর নজর রাখা প্রয়োজন। অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে অপরাধী হিসেবে চূড়ান্তভাবে বিবেচনা করা যায় না।