সংবাদ প্রকাশের জেরে সাংবাদিক মাহাবুব চান্দুকে শারীরিকভাবে আঘাত করার এবং মেহেরপুরে সাংবাদিকতা করতে না দেওয়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে আহাম্মদ আলী টেকনিক্যাল কলেজের প্রভাষক রাকিবুল হাসান রিপনের বিরুদ্ধে। তিনি মেহেরপুর জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের ছোট ভাই।

সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নিয়ে প্রকাশিত একটি সংবাদকে কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটেছে বলে জানিয়েছেন ভুক্তভোগী সাংবাদিক। তাঁর অভিযোগ, ফোনে গালিগালাজের পাশাপাশি তাঁকে এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রকাশকারী অন্য সাংবাদিকদের মেহেরপুরে সাংবাদিকতা করতে না দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় মেহেরপুর সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সাংবাদিক নেতারা।

রোববার (১১ অক্টোবর) দুপুরে মাহাবুব চান্দুর মুঠোফোনে কল করে তাঁকে হুমকি দেওয়া হয় বলে অভিযোগ। মাহাবুব চান্দু দৈনিক এদিন পত্রিকার মেহেরপুর প্রতিনিধি, মেহেরপুর জেলা প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক এবং ডিএফপি-তালিকাভুক্ত একটি স্থানীয় পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক।

সংবাদ প্রকাশের জেরে হুমকির অভিযোগ

মাহাবুব চান্দু জানান, ‘মেহেরপুরে সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণ ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ’ শিরোনামে মেহেরপুর প্রতিদিন পত্রিকায় একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উল্লেখ করার কারণেই তাঁকে ফোন করে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়া হয়েছে বলে তাঁর দাবি।

মাহাবুব চান্দুর ভাষ্য অনুযায়ী, ফোনে রাকিবুল হাসান রিপন তাঁকে বলেন, ‘পিঠের ছাল তুলে নেব শুয়োরের বাচ্চা, তুই কোথায় আছিস বল।’ এরপর তিনি কলটি কেটে দেন বলে জানান।

ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও লিখেছেন মাহাবুব চান্দু। তাঁর দাবি, হুমকির ফোনালাপের রেকর্ড তাঁর কাছে রয়েছে।

অভিযোগ স্বীকার, ব্যাখ্যা দাবি রিপনের

অভিযোগের বিষয়ে রাকিবুল হাসান রিপনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রকাশিত সংবাদে সার ডিলার নিয়োগে দলীয়করণের কথা উল্লেখ করার বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে প্রতিবেদনে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ কেন আনা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি ব্যাখ্যা চেয়েছেন বলে জানান।

রিপনের বক্তব্য, এ বিষয়ে জবাব বা ব্যাখ্যা দিতে না পারলে মাহাবুব চান্দুকে মেহেরপুরে সাংবাদিকতা করতে দেওয়া হবে না।

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা এখন সরকারে আছি, যারা বিএনপি করেছে তারা একটু সুবিধা পাবে, এটাই স্বাভাবিক।’

মাহাবুব চান্দুর পত্রিকায় আয়নাঘর ও শেখ হাসিনার ভারত চলে যাওয়া নিয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার অভিযোগও তোলেন রিপন। তাঁর দাবি, এসব বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করে সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতির অভিযোগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়েছে।

রিপন আরও হুঁশিয়ারি দেন, এ বিষয়ে হিসাব মেলাতে না পারলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান রাখা হবে না এবং প্রতিবেদন প্রকাশকারী সাংবাদিকদেরও মেহেরপুরে সাংবাদিকতা করতে দেওয়া হবে না।

তবে ফোনালাপের সম্পূর্ণ রেকর্ড, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া মন্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট সংবাদটির পূর্ণাঙ্গ তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

সম্পাদককেও বার্তা দিয়ে চাপ দেওয়ার অভিযোগ

স্থানীয় পত্রিকাটির সম্পাদক ও কালের কণ্ঠের মেহেরপুর জেলা প্রতিনিধি ইয়াদুল মোমিন বলেন, তাঁর পত্রিকার ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মাহাবুব চান্দুকে মুঠোফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি দেওয়ার ঘটনায় তাঁরা আইনগত পদক্ষেপ নিচ্ছেন।

ইয়াদুল মোমিনের অভিযোগ, রাকিবুল হাসান রিপন তাঁকেও মেসেঞ্জারে বার্তা পাঠিয়ে প্রকাশিত সংবাদ সংশোধনের জন্য চাপ দিয়েছেন। পরে এ ঘটনার জন্য জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট কামরুল হাসান মাহাবুব চান্দুকে ফোন করে দুঃখ প্রকাশ করেছেন বলেও জানান তিনি।

এ বিষয়ে অ্যাডভোকেট কামরুল হাসানের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। ফলে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

সাংবাদিকদের নিন্দা, তদন্তের আশ্বাস পুলিশের

সাংবাদিককে হুমকি দেওয়ার খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর মেহেরপুরে কর্মরত প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা ঘটনার নিন্দা জানিয়েছেন। তাঁরা অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত এবং সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।

মেহেরপুর জেলা প্রেসক্লাবের সভাপতি ও দৈনিক যুগান্তরের জেলা প্রতিনিধি তোযাম্মেল আযম বলেন, এ ঘটনায় তাঁরা আইনি পদক্ষেপ নেবেন এবং আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকবেন। হুমকির ঘটনায় মেহেরপুর সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মেহেরপুরের পুলিশ সুপার আলী হায়দার চৌধুরী বলেন, বিষয়টি নিয়ে জিডি করা হলে তদন্ত সাপেক্ষে হুমকিদাতার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সাংবাদিকের নিরাপত্তা, সংবাদ প্রকাশের স্বাধীনতা এবং সরকারি বা রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাবমুক্তভাবে অভিযোগ তদন্তের প্রশ্নটি এ ঘটনায় সামনে এসেছে। তবে অভিযোগের সত্যতা ও দায় নির্ধারণের বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন।