হলুদাভ পাকা সুপারিতে ছেয়ে গেছে কক্সবাজারের হাটবাজার। কোথাও থরে থরে সাজানো সুপারি, কোথাও আবার গাছের থোকা নিয়ে ব্যস্ত কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। বাম্পার ফলনে জেলার গ্রামাঞ্চলের সুপারি বাগানগুলোতে এখন যেন চলছে ফলনের উৎসব। ভালো ফলনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ব্যবসায়ী ও আড়তদারদের ব্যস্ততাও।

কক্সবাজারে সুপারি এখন শুধু পান-সংস্কৃতির অনুষঙ্গ নয়; এটি ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ অর্থকরী ফসলে পরিণত হচ্ছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় বাড়ছে সুপারি বাগানের পরিধি, উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহের পর বিদেশের বাজারেও যাচ্ছে কক্সবাজারের সুপারি।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে কক্সবাজারে প্রায় ৮ হাজার ৬৭০ একর জমিতে ছোট-বড় ৩১ হাজার ৫৯০টি সুপারি বাগান রয়েছে। এসব বাগান থেকে প্রায় ২ লাখ ১২ হাজার মেট্রিক টন কাঁচা সুপারি উৎপাদনের তথ্য পাওয়া গেছে। শুকানোর পর তা থেকে প্রায় ১৪ হাজার ৫০০ মেট্রিক টন শুকনা সুপারি পাওয়া যেতে পারে। পাইকারি বাজারদর ধরে শুকনা সুপারির সম্ভাব্য বাজারমূল্য প্রায় ৮৭০ কোটি টাকা হতে পারে বলে কৃষি-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন।

কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, কক্সবাজারের আবহাওয়া ও মাটি সুপারি চাষের জন্য বেশ উপযোগী। তুলনামূলক কম খরচ ও পরিচর্যায় দীর্ঘ সময় ফলন পাওয়ায় অনেক কৃষক ধান বা অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি বাণিজ্যিকভাবে সুপারি বাগানের দিকে ঝুঁকছেন। চলতি মৌসুমে অনুকূল আবহাওয়া ও আধুনিক চাষপদ্ধতির কারণে ফলনও ভালো হয়েছে।

জেলার উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, পেকুয়া, কক্সবাজার সদরসহ বিভিন্ন এলাকায় সুপারি চাষের বিস্তার ঘটেছে। বিশেষ করে উখিয়া ও টেকনাফের বড় আকারের সুপারি দেশের বিভিন্ন বাজারে আলাদা পরিচিতি পেয়েছে। আকার ও স্বাদের কারণে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা অনেক সময় বড় সুপারিকে ‘আপেল সুপারি’ বলে থাকেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ ধরনের সুপারি দেশের বাইরেও যাচ্ছে।

উখিয়ার সোনারপাড়া বাজারসহ জেলার বিভিন্ন হাটে এখন সুপারি কেনাবেচা জমে উঠেছে। ব্যবসায়ীরা জানান, উৎপাদন বাড়ায় বাজারে সরবরাহও বেড়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের পাইকাররা এসব বাজার থেকে সুপারি কিনে ট্রাকে করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ বিভিন্ন জেলায় পাঠাচ্ছেন।

চাষিরা জানান, আকারভেদে কাঁচা সুপারি ভালো দামে বিক্রি হচ্ছে। সাম্প্রতিক বাজারে মাঝারি আকারের সুপারি প্রতি পিস ৮ থেকে ১০ টাকা এবং বড় আকারের সুপারি ১০ থেকে ১৬ টাকা পর্যন্ত বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে।

কক্সবাজারের সুপারির বড় একটি সম্ভাবনা রয়েছে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানিতে। স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি শুকনা সুপারি দেশের বিভিন্ন পাইকারি বাজার হয়ে বিদেশেও যাচ্ছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে বসবাসরত বাংলাদেশি, ভারতীয় ও পাকিস্তানি জনগোষ্ঠীর কারণে সুপারির চাহিদা রয়েছে। তবে রপ্তানির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ ও আয় সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য সরকারি তথ্য না থাকায় এ বিষয়ে বড় অঙ্কের দাবি করার ক্ষেত্রে সতর্কতা প্রয়োজন।

সংরক্ষণে অবকাঠামোর ঘাটতি

সুপারি উৎপাদনে সাফল্য এলেও সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে রয়েছে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা। স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা ও প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধা না থাকায় মৌসুমে অতিরিক্ত সরবরাহের সময় সুপারি নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। এতে কৃষক ও ব্যবসায়ীদের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়।

রামু স্টেশন বাজারের সুপারি ব্যবসায়ী ও আড়তদার কলিমউল্লাহ বলেন, “এবার জেলায় ফলন ভালো হয়েছে। প্রতিদিন নোয়াখালী, ঢাকা ও চট্টগ্রামের মহাজনদের কাছে ট্রাকে করে সুপারি পাঠাচ্ছি। তবে সংরক্ষণের সুব্যবস্থা না থাকায় মৌসুমের শেষে অনেক সুপারি নষ্ট হয়ে যায়। কক্সবাজারে একটি আধুনিক সুপারি প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র হলে কৃষক ও ব্যবসায়ী—দুই পক্ষই উপকৃত হবেন।”

চাষে দীর্ঘমেয়াদি লাভের সম্ভাবনা

কৃষি-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সুপারি গাছ দীর্ঘ সময় ধরে ফলন দেয়। সাধারণত চারা রোপণের কয়েক বছর পর গাছে ফলন শুরু হয় এবং পরিণত গাছে নিয়মিত ফলন পাওয়া যায়। ফলে একবার বাগান গড়ে তুলতে পারলে দীর্ঘমেয়াদে কৃষকের আয় করার সুযোগ থাকে।

কক্সবাজারের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. বিমল কুমার প্রামাণিক বলেন, অনুকূল পরিবেশ ও আধুনিক চাষপদ্ধতির কারণে চলতি মৌসুমে সুপারির উৎপাদন ভালো হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে সুপারি বাগানও গড়ে উঠছে। বাজারে চাহিদা থাকায় কৃষকেরা ভালো দাম পাচ্ছেন এবং এতে বাগানমালিক ও চাষিরা লাভবান হচ্ছেন।

তিনি আরও বলেন, সুপারি চাষে রোগবালাই ব্যবস্থাপনা, পরিচর্যা ও বাজারজাতকরণে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি কক্সবাজারের সুপারি বিদেশের বাজারেও যাচ্ছে।

কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, উৎপাদনের পাশাপাশি আধুনিক সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও রপ্তানি অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে কক্সবাজারের সুপারি খাত আরও বড় বাণিজ্যিক সম্ভাবনায় পরিণত হতে পারে। এতে কৃষকের আয় বাড়ার পাশাপাশি জেলার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও এর অবদান আরও বাড়বে।