শারদীয় দুর্গাপূজাকে ঘিরে কুমিল্লার লাকসাম উপজেলার বিভিন্ন পূজামণ্ডপে চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমায় রং ও অলংকরণের কাজে দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয়সহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা মৃৎশিল্পীরা। পূজা উদযাপন কমিটিগুলোও মণ্ডপ সাজসজ্জা ও অন্যান্য প্রস্তুতি শেষ করতে ব্যস্ত সময় পার করছে।

পূজা উদযাপন কমিটির নেতাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এবার লাকসাম উপজেলায় ৩৮টি পূজামণ্ডপে শারদীয় দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে। আগামী ১৬ অক্টোবর ঘটপূজা, বোধন ও ষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দুর্গোৎসবের সূচনা হবে। ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমী ও প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে পাঁচ দিনব্যাপী এ উৎসবের সমাপ্তি হবে।

লাকসাম পৌর শহরের মুক্তকেশী কালীবাড়ি, উত্তর বাজার বণিকবাড়ি, জগন্নাথ দেবালয়, দক্ষিণ লাকসামের প্রয়াত নিরঞ্জন বণিকের বাড়ি, মিশ্রি, পেয়ারাপুর, রাজরাজেশ্বরী দুর্গামন্দির, পশ্চিমগাঁও সাহাপাড়া, ঠাকুরপাড়া, ধামৈচা, রেলওয়ে মেডিকেল কলোনি, কৈত্রা, কোঁয়ার, দেবীপুর, উত্তর গাজীপুর, উধাইর, শ্রীয়াং, ডুমরিয়া, কেমতলী, নোয়াপাড়া, চানগাঁও ও চুনাতিসহ বিভিন্ন মণ্ডপে প্রতিমায় রং ও অলংকরণের কাজ চলছে।

আয়োজকরা জানান, প্রতিমা তৈরি, মণ্ডপ সাজসজ্জা ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজে প্রতিটি মণ্ডপে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে। মণ্ডপভেদে আয়োজনের ধরন ও ব্যয়ের পরিমাণে পার্থক্য রয়েছে।

মৃৎশিল্পীরা জানান, শ্রাবণ মাস থেকে চুক্তিভিত্তিক প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করেন তারা। একটি প্রতিমা তৈরিতে প্রায় সাড়ে তিন মাস সময় লাগে। বাঁশ, কাঠ, খড়, পাট, রশি ও মাটি দিয়ে প্রতিমার কাঠামো তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শেষ হয়েছে। মাটি শুকানোর পর এখন চলছে রং ও অলংকরণের কাজ।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ছোট আকৃতির প্রতিমা তৈরিতে ৮০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা এবং বড় প্রতিমার ক্ষেত্রে ৫ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি নেওয়া হয়। বংশপরম্পরায় প্রায় ৩৫ বছর ধরে তারা প্রতিমা তৈরির সঙ্গে যুক্ত।

বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের লাকসাম উপজেলা কমিটির সভাপতি রণজিৎ সাহা টাবলু বলেন, “অশুভ শক্তির বিনাশ ও শুভ শক্তির প্রতিষ্ঠাই দুর্গোৎসবের মূল দর্শন। সব সম্প্রদায়ের মানুষের অংশগ্রহণে প্রতিবছর উৎসবমুখর পরিবেশে পূজা উদযাপন করা হয়।” লাকসামের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির ঐতিহ্য আরও সুদৃঢ় হবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সংগঠনের উপজেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিশ্বতম সাহা বিশু বলেন, “দুর্গোৎসব শুধু ধর্মীয় আয়োজন নয়, এটি সংস্কৃতির একটি মিলনমেলা। হিংসা, বিদ্বেষ ও অহংকার পরিহার করে মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের চর্চাই এ উৎসবের মূল বার্তা।”

পশ্চিমগাঁও ঠাকুরপাড়া দুর্গামন্দির পরিচালনা কমিটির সভাপতি শিশির কুমার আচার্য বলেন, প্রতিমা তৈরির ব্যয় কিছুটা বাড়লেও তাদের সার্বিক প্রস্তুতি প্রায় শেষ পর্যায়ে। দীর্ঘদিনের সম্প্রীতি ও ঐক্যের ঐতিহ্য ধরে রেখে সবাই দেশের কল্যাণে নিজ নিজ অবস্থান থেকে অবদান রাখবেন বলে তিনি প্রত্যাশা করেন।

দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন লাকসাম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) নার্গিস সুলতানা। তিনি বলেন, উপজেলা প্রশাসন, পৌরসভা ও থানা পুলিশের পক্ষ থেকে পূজামণ্ডপগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

লাকসাম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী কামরুন নাহার লাইলী বলেন, উপজেলার ৩৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব অনুষ্ঠিত হবে। পূজামণ্ডপগুলোতে পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা দায়িত্ব পালন করবেন। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ টহলসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিপন্থী কর্মকাণ্ডে তাৎক্ষণিক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে পূজামণ্ডপের নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।

লাকসাম মুক্তকেশী কালীবাড়ি মন্দিরের পুরোহিত প্রফুল্ল কুমার আচার্য বলেন, এ বছর দেবীর আগমন হবে গজে এবং গমন হবে দোলায়।