সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে জনসচেতনতা তৈরির পাশাপাশি সুনামগঞ্জের টাঙ্গুয়ার হাওরের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য ও টেকসই পর্যটন নিয়ে কাজ করছেন ধর্মপাশার তরুণ উদ্যোক্তা নাজমুল হক সজীব। সম্প্রতি হাওর ও নদী সংরক্ষণে কাজ করা সংগঠন ‘হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলন’-এর ধর্মপাশা উপজেলা শাখার নির্বাহী সদস্য হিসেবে তিনি দায়িত্ব পেয়েছেন।

গত ২ অক্টোবর ধর্মপাশা উপজেলা সম্মেলন কক্ষে সংগঠনটির প্রথম দ্বিবার্ষিক সম্মেলনে শাহ কুতুবকে সভাপতি এবং ইমাম হোসেনকে সাধারণ সম্পাদক করে ৩৫ সদস্যের উপজেলা কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির নির্বাহী সদস্যদের তালিকায় নাজমুল হক সজীবের নাম রয়েছে।

সম্মেলনে হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, নদী-খাল ও জলাভূমি দখলমুক্ত করা, পরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা, প্রকৃত জেলেদের মাছ ধরার অধিকার নিশ্চিত করা এবং জলমহাল ইজারা প্রক্রিয়ায় অনিয়ম বন্ধের দাবি জানানো হয়। একই সঙ্গে হাওরের ফসলরক্ষা বাঁধ ও উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম, ধীরগতি ও দুর্নীতি প্রতিরোধের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।

এর আগে টাঙ্গুয়ার হাওরকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি ভিডিও নিয়ে জিডি করে আলোচনায় এসেছিলেন সজীব। ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই ধর্মপাশা থানায় করা ওই সাধারণ ডায়েরিতে তিনি অভিযোগ করেন, ভিডিওটির কিছু বক্তব্য টাঙ্গুয়ার হাওর সম্পর্কে পর্যটকদের মধ্যে নেতিবাচক ধারণা তৈরি করতে পারে এবং এর প্রভাব স্থানীয় পর্যটননির্ভর জীবিকায় পড়তে পারে। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই জিডির নম্বর ছিল ৫৮২।

স্থানীয় ও বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে সজীবকে সাইবার নিরাপত্তাবিষয়ক তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিরাপত্তা, ভুয়া অ্যাকাউন্ট, অনলাইন প্রতারণা এবং বিভিন্ন ধরনের সাইবার ঝুঁকি নিয়ে সচেতনতা তৈরিতে তাঁর কর্মকাণ্ডের কথাও প্রতিবেদনে এসেছে।

টাঙ্গুয়ার হাওর বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মিঠাপানির জলাভূমি এবং আন্তর্জাতিক গুরুত্বসম্পন্ন রামসার সাইট। ২০০০ সালের ১০ জুলাই হাওরের ৯,৫০০ হেক্টর এলাকা রামসার সাইট হিসেবে তালিকাভুক্ত হয়। রামসার নথিতে এই জলাভূমিতে অন্তত ১৩৫ প্রজাতির মাছ ও ২০৮ প্রজাতির পাখির আবাসস্থলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

তবে রামসার সাইটের নির্ধারিত ৯,৫০০ হেক্টর এবং বৃহত্তর টাঙ্গুয়ার হাওরের বর্তমান ব্যবস্থাপনা-পরিসরকে এক করে দেখা ঠিক নয়। সাম্প্রতিক সরকারি তথ্যের ভিত্তিতে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বিএসএস) জানিয়েছে, তাহিরপুর ও মধ্যনগর উপজেলার চারটি ইউনিয়ন ও ১৮টি মৌজা নিয়ে বৃহত্তর হাওরটির আয়তন প্রায় ১২ হাজার ৬৫৫ হেক্টর। এতে ১০৯টি ছোট-বড় বিল রয়েছে এবং আশপাশের ৮৮টি গ্রামের প্রায় ৬০ হাজার মানুষ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হাওরের ওপর নির্ভরশীল।

এই বিপুল জীবিকা-নির্ভরতার বিপরীতে হাওরটির ওপর বাড়ছে নানা ধরনের পরিবেশগত চাপ। অতিরিক্ত মাছ আহরণ, আবাসস্থলের অবক্ষয়, বর্জ্য ও প্লাস্টিক দূষণ এবং অপরিকল্পিত পর্যটন ব্যবস্থাপনা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে উদ্বেগ রয়েছে। টাঙ্গুয়ার হাওরের জীববৈচিত্র্য পুনরুদ্ধার ও প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনা নিয়ে ২০২৬ সালেও নতুন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

পরিবেশগত চাপ মোকাবিলায় ২০২৬ সালের আগস্টে সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসন টাঙ্গুয়ার হাওর নিয়ে নতুন নির্দেশনা জারি করে। নির্দেশনায় পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকার (ECA) নির্ধারিত অংশে হাউসবোট ও পর্যটকবাহী ইঞ্জিনচালিত নৌযান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা, সব পর্যটকবাহী নৌযানের নিবন্ধন, অনুমতিবিহীন নৌযান চলাচল বন্ধ এবং নৌযানে সেপটিক ট্যাংক ও বর্জ্য সংরক্ষণের ব্যবস্থা রাখার কথা বলা হয়েছে। একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক ও উচ্চ শব্দের ওপরও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।

তবে এসব বিধিনিষেধকে পুরো টাঙ্গুয়ার হাওরে পর্যটন বন্ধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা যাবে না। প্রশাসনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নিষেধাজ্ঞা মূলত ECA-ভুক্ত সংরক্ষিত অংশে প্রযোজ্য; হাওরের অন্যান্য অংশে নির্ধারিত শর্ত মেনে পর্যটন কার্যক্রম চালুর সুযোগ রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের উপজেলা কমিটিতে সজীবের অন্তর্ভুক্তি তাঁর পরিবেশ সংরক্ষণমূলক সাংগঠনিক সম্পৃক্ততার একটি নতুন দৃষ্টান্ত। তবে নির্বাহী সদস্য হিসেবে তাঁর সুনির্দিষ্ট দায়িত্ব, ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা এবং পরিবেশসংরক্ষণে তাঁর ব্যক্তিগত উদ্যোগের পরিমাপযোগ্য ফলাফল সম্পর্কে এখনো প্রকাশ্য সূত্রে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায় না।

টাঙ্গুয়ার হাওরকে রক্ষা করার চ্যালেঞ্জ তাই শুধু পর্যটন নিয়ন্ত্রণে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে স্থানীয় মানুষের জীবিকা, মৎস্যসম্পদের অধিকার, জলাভূমির স্বাভাবিক প্রবাহ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পর্যটনকে পরিবেশবান্ধব ও টেকসই করার প্রশ্ন। স্থানীয় সংগঠন, প্রশাসন ও জনগোষ্ঠীর সমন্বিত অংশগ্রহণ ছাড়া এই ভারসাম্য দীর্ঘমেয়াদে নিশ্চিত করা কঠিন।

টাঙ্গুয়ার হাওরের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে উন্নয়ন ও পর্যটনের প্রয়োজনের সঙ্গে এর প্রতিবেশগত সীমাবদ্ধতাকে কতটা কার্যকরভাবে সমন্বয় করা যায়, তার ওপর।