ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলায় বাসাবাড়িতে কাজ দেয়ার কথা বলে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরীকে দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক যৌন দাসী বানানোর অভিযোগ উঠেছে তারই আত্মীয়ের বিরুদ্ধে। এতে রাজি না হওয়ায় ওই কিশোরীকে বিভিন্ন সময় শারীরিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি দেখানো হতো। কক্ষে আটকে রেখে মারধর এবং গরম চামচ ও খুন্তি দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে ছ্যাঁকা দেয়ার অভিযোগও উঠেছে। তবে মাত্র ৬ হাজার টাকা পেয়ে এই ঘটনায় থানায় মামলা দিতে রাজি নয় নিপীড়নের শিকার ওই কিশোরীর পরিবার।

স্থানীয় বাসিন্দা, কিশোরীর স্বজন, ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার ধরমন্ডল ইউনিয়নের ওই কিশোরীকে তার পরিবার দূর-সম্পর্কের ফুফা মৃত জামাল মিয়ার বাড়িতে গৃহকর্মী হিসেবে পাঠায়। অভিযোগ, সেখানে ফুফাতো বোন তাসলিমা বেগম, তাঁর স্বামী রাজা মিয়া, বোন খাদিজা বেগম ও ভাই লালন মিয়া তাকে গৃহকাজের পরিবর্তে দীর্ঘদিন ধরে জোরপূর্বক বিভিন্ন জনের সাথে শারীরিক সম্পর্ক করতে বাধ্য করেন। এতে রাজি না হলে তাকে মারধোর ও ভয়ভীতি দেখানো হতো বলে অভিযোগ করেছে ওই কিশোরী।

গত প্রায় ১০/১২ দিন আগে ওই কিশোরী সেখান থেকে পালিয়ে নিজ বাড়িতে চলে আসে। এরপর গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যায় পান-সুপারি কিনতে বাড়ি থেকে বাজারের দিকে গেলে তাকে জোর করে তুলে ওই পরিবারের বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ওঠে। সেখানে একটি কক্ষে আটকে রেখে মুখ বেঁধে নির্যাতন করা হয় বলে অভিযোগ করেছে কিশোরী।

এদিকে, গত শুক্রবার (০২ অক্টোবর) বিকেলে বিষয়টি মীমাংসার জন্য কিশোরীর দুই চাচা অভিযুক্ত পরিবারের সদস্যদের সাথে বসেন বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন। সেখানে ৫০ হাজার টাকায় বিষয়টি মীমাংসা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত পরিবারের পক্ষ থেকে ওই টাকা দেয়া হয়। তবে এর মধ্যে কিশোরীর পরিবার পায় মাত্র ৬ হাজার টাকা। বাকী টাকা তাঁর দুই চাচা নিজেদের কাছে রেখে দিয়েছেন।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর স্থানীয় বাসিন্দারা কিশোরীর বাড়িতে যায়। এসময় ওই কিশোরী তাদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়ে। ভুক্তভোগী কিশোরী এসময় জানায়, দীর্ঘদিন ধরে তাকে নির্যাতন করে জোরপূর্বক যৌনকাজে বাধ্য করা হয়। এক পর্যায়ে তাকে গরম চামচ ও খুন্তি দিয়ে দুই হাতের কনুইয়ের ওপর এবং পিঠে ছ্যাঁকা দেওয়া হয়। এ ছাড়া ধারালো কোনো বস্তু দিয়ে তাঁর ডান পায়েও আঘাত করা হয়। পরে তার কান্নার শব্দ শুনে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি তাকে উদ্ধার করেন। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি জানায় কিশোরী।

এ বিষয়ে ওই কিশোরীর বাবা-মা সাংবাদিকদের কাছে কোন মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। তবে আপন চাচা পরিচয়ে একজন বলেন, বিষয়টি আত্মীয় স্বজনের মধ্যে ঘটেছে। আমরা নিজেরা বসে বিষয়টি শেষ করে দিয়েছি।

এ ব্যাপারে ধরমন্ডল ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাফিকুল ইসলাম জানান, ঘটনাটি একেবারে ন্যাক্কারজনক। কয়েকজন বসে মাত্র ৫০ হাজার টাকা রায় করে ঘটনাটি ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করছে। এরমধ্যে ওই কিশোরীর পরিবার পেয়েছে মাত্র ৬ হাজার টাকা। এই ঘটনা তো শালিসি সমাধান হতে পারে না। সেই সালিশকারকরা এখন গা-ঢাকা দিয়েছেন। তিনি আরও জানান, খবর পেয়ে গত শনিবার বিকেলে থানার পরিদর্শক (তদন্ত) ইউনিয়ন পরিষদে এসেছিলেন। ভুক্তভোগী কিশোরীর পরিবারকে আসতে বলা হলে তার মা এসেছিলেন। কিশোরীর মা স্বীকার করেছেন ৬ হাজার টাকা পেয়েছেন। তারা থানায় কোন অভিযোগ দিবেন না।

এ ব্যাপারে নাসিরনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনুল ইসলাম জানান, এই ঘটনায় কোন লিখিত অভিযোগ আমরা পাইনি। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে পুলিশ পাঠানো হয়েছিল। সেখানে যাওয়ার পর ভুক্তভোগী কিশোরীর জানায়, তারা কোন মামলা দিবে না। অভিযোগ না দিলে আমরা তো কিছু করতে পারছি না।