জামালপুরের সিংহজানি খাদ্য গুদামের সংরক্ষণ ও চলাচল কর্মকর্তা (এসএমও) ইসরাত আহমেদ পাপেলের বিরুদ্ধে কর্মস্থলে অনিয়মিত উপস্থিতি, চাল সংগ্রহে ঘুষ নেওয়া, নিম্নমানের চাল গ্রহণসহ একাধিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কিছু নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা হয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

তবে অভিযোগগুলোর সবকটি স্বাধীনভাবে প্রমাণিত নয়। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এসব অভিযোগকে ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন। খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তারাও কয়েকটি অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত বা তথ্য যাচাইয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন।

অফিসে অনুপস্থিতির অভিযোগ

স্থানীয় সূত্র ও সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ইসরাত আহমেদ পাপেল ময়মনসিংহে বসবাস করেন এবং ব্যক্তিগত গাড়িতে জামালপুরের কর্মস্থলে যাতায়াত করেন।

২৪ সেপ্টেম্বর সিংহজানি খাদ্য গুদামে গিয়ে তাকে কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। ওই দিন তিনি ছুটিতে ছিলেন কি না, সে বিষয়ে অফিসের অন্য কর্মকর্তারা নিশ্চিত তথ্য দিতে পারেননি।

একজন অফিস স্টাফ নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ইসরাত আহমেদ ময়মনসিংহে থাকেন এবং সেখান থেকেই অফিসে যাতায়াত করেন। অন্যদিকে খাদ্য পরিদর্শক সরকার জানান, পাপেল ব্যক্তিগত গাড়িতে অফিসে আসেন এবং কোনো কারণে আসতে না পারলে ছুটি নেন।

জামালপুরের ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আসাদুজ্জামান খান বলেন, ২৪ সেপ্টেম্বর ইসরাত আহমেদ অফিসে উপস্থিত ছিলেন না। তিনি ওই দিনের ছুটির বিষয়ে অবগত ছিলেন না বলেও জানান। তবে ব্যক্তিগত গাড়িতে তার কর্মস্থলে আসার বিষয়টি তিনি জানেন বলে জানান।

চাল সংগ্রহে ঘুষের অভিযোগ

সিংহজানি খাদ্য গুদামের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বোরো মৌসুমে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১২ হাজার ৪৩০ মেট্রিক টন, যা পূরণ হয়েছে। একই মৌসুমে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন।

এর আগের ২০২৫ সালের বোরো মৌসুমে চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ৫৩৭ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে সংগ্রহ করা হয় ১১ হাজার ৯০৫ মেট্রিক টন। ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৪৪৫ মেট্রিক টন, যা পূরণ হয়েছে বলে গুদামের তথ্য থেকে জানা যায়।

তবে গত দুই মৌসুমে ধান ও চাল সংগ্রহে অনিয়মের অভিযোগ করেছেন কয়েকজন মিল মালিক ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তাদের অভিযোগ, গুদামে চাল সরবরাহের ক্ষেত্রে প্রতি টনে ৮০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ দাবি করা হয়। টাকা না দিলে বিভিন্ন অজুহাতে চাল ফেরত পাঠানো কিংবা বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়।

তবে এসব অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা প্রত্যক্ষ প্রমাণ এই প্রতিবেদনের হাতে আসেনি।

গুদামে চাল সরানোর ঘটনায় তদন্ত

সিংহজানি খাদ্য গুদাম থেকে গত বছর ১৫ মেট্রিক টন চাল কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগে একটি গাড়ির চালকসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের কথাও জানিয়েছেন জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ।

ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আসাদুজ্জামান খান বলেন, ওই ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। তবে গাড়িচালকের কাছ থেকে সংশ্লিষ্টদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া না যাওয়ায় কাউকে দায়ী করা যায়নি।

এ ছাড়া পুরোনো বস্তা গ্রহণ, নিম্নমানের চাল গুদামে ঢোকানো এবং বিভিন্ন সময় জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের পরিদর্শনে অনিয়ম ধরা পড়ার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সুনির্দিষ্ট নথি বা তদন্ত প্রতিবেদন স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে অভিযোগ ও তদন্তের দাবি

ইসরাত আহমেদ পাপেলের বিরুদ্ধে এক নারীর সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। অভিযোগটি নিয়ে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের নির্দেশে তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি করা হলেও এর কোনো আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি।

জামালপুরের ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আসাদুজ্জামান খান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হলেও কেউ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ করেননি। বিষয়টি ইসরাত আহমেদের নিজ এলাকার হওয়ায় জামালপুরে তদন্ত করে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

ইসরাত আহমেদ পাপেল অভিযোগটি অস্বীকার করে বলেন, ওই নারীর সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছিল তিনি আগে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চাকরি করার সময়। পরে ওই নারীর স্বামী অসুস্থ হলে তাকে আর্থিক সহায়তা দিয়েছিলেন। তার দাবি, পরবর্তীতে টাকা না দেওয়ায় ওই ব্যক্তিই তার বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ ছড়াচ্ছেন।

রাজনৈতিক সম্পৃক্ততার দাবি

প্রতিবেদনে ইসরাত আহমেদ পাপেলের পরিবারের রাজনৈতিক পরিচয় এবং আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কর্মসূচিতে তার অংশগ্রহণের দাবি করা হয়েছে। তবে সরকারি চাকরিতে থাকা কোনো কর্মকর্তার বর্তমান রাজনৈতিক পদ বা সক্রিয় সম্পৃক্ততার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য দলিল স্বাধীনভাবে যাচাই করা যায়নি।

তাই এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের আনুষ্ঠানিক নথি বা যাচাইকৃত তথ্য ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তমূলক বক্তব্য দেওয়া যাচ্ছে না।

সম্পদের বিষয়ে প্রশ্ন

ইসরাত আহমেদ পাপেলের নামে ময়মনসিংহ শহরে ফ্ল্যাট, গফরগাঁওয়ে বাড়ি এবং ব্যক্তিগত গাড়িসহ বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগও প্রতিবেদনে রয়েছে। এসব সম্পদের মূল্য ও মালিকানা সম্পর্কিত সরকারি নথি এই প্রতিবেদনের হাতে নেই।

এ বিষয়ে ইসরাত আহমেদ পাপেল বলেন, গাড়ি ও বাড়িসহ যেসব সম্পদের কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো তার বাবা করে গেছেন। বাবার সম্পত্তি হিসেবে তিনি সেগুলো ব্যবহার করছেন।

কর্মকর্তার বক্তব্য

তার বিরুদ্ধে ওঠা অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে ইসরাত আহমেদ পাপেল বলেন, খাদ্য বিভাগের একটি পক্ষ তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য ছড়াচ্ছে।

তিনি ঘুষ গ্রহণ, চাল সংগ্রহে অনিয়ম ও অন্যান্য অভিযোগ অস্বীকার করেন।

অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নথি, তদন্ত প্রতিবেদন এবং আর্থিক সম্পদের বৈধ উৎস যাচাই করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে আরও নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে।