যদি কোনো খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা অনুমোদন ছাড়া নিজ কর্মস্থলে না থাকেন, তবে তা ‘বাংলাদেশ সরকারি চাকরিজীবী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০০৪’-এর আওতায় একটি শৃঙ্খলা ভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এর ফলে তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হতে পারে এবং প্রমাণিত হলে বেতন কর্তন, সাময়িক বরখাস্ত বা এমনকি চাকরি থেকে অপসারণ পর্যন্ত শাস্তি হতে পারে। কাগজে কলমে এমন আইন থাকলেও জামালপুরের এক খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার বেলায় তা যেনো উপেক্ষিত। সেই খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা সপ্তাহে তিন-চার দিন সকাল ১১টা থেকে ১২টায় ব্যাক্তিগত গাড়ি নিয়ে অফিসে আসেন। আবার বিকেলে পাশের জেলা ময়মনসিংহে পরিবারের কাছে চলে আসেন। এভাবেই চলছে গত দুই বছর ধরে। এছাড়াও রয়েছে তার বিরুদ্ধে রয়েছে ব্যাপক ঘুষ বানিজ্য ও নৈতিক স্খলনের অভিযোগ।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এসকল কর্মকান্ড নিয়ে ব্যাপক আলোচিত এই খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার নাম ইসরাত আহমেদ পাপেল। তিনি জামালপুর সিংহজানি খাদ্য গুদামের এসএমও হিসেবে গত দুই বছর যাবৎ দায়িত্ব পালন করছেন।
ইসরাত আহমেদ পাপেলের এসকল অনিয়ম নিয়ে সরেজমিন অনুসন্ধান চালালে বেরিয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য।
ইচ্ছে হলে নিজের গাড়ি নিয়ে অফিসে আসেন—
গত বৃহস্পতিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে সরেজমিনে সিংজানি খাদ্যগুদামে গিয়ে দেখা যায় অফিস প্রধান ইসরাত আহমেদ পাপেল অফিসে নেই। অফিসের অন্যান্য কর্মকর্তারা জানান, আজ তিনি অফিসে আসেনি। ছুটি নিয়েছেন কিনা সে বিষয়ে তারা কিছু বলতে পারেনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জন অফিস স্টাফ জানান, “স্যার তো ময়মনসিংহে থাকেন। সেখান থেকে অফিস করেন। মাঝে মধ্যে আসতে পারেন না”
একই অফিসে কর্মরত খাদ্য পরিদর্শক সরকার জানান, পাপেল স্যারের নিজস্ব গাড়ি আছে। তা দিয়েই অফিসে আসেন। মাঝে মধ্যে সমস্যা হলে আসতে পারেন না। তখন ছুটি নেন”
এ বিষয়ে জেলার ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আসাদুজ্জামান খান জানান, বৃহস্পতিবার সিংজানি খাদ্য গুদাম কর্মকর্তা ইসরাত আহমেদ অফিসে আসেনি। বিষয়টি তিনি জানেন না। তাছাড়া ইসরাত আহমেদ প্রায়ই অফিসে আসেনা এটিও তার জানা নেই। ইসরাত আহমেদ কোন ছুটিও নেননি। তবে অফিসে ব্যাক্তিগত গাড়ি নিয়ে আসেন এ বিষয়টি তিনি জানেন।
কোটি টাকা ঘুষ আদায়—
সিংজানি খাদ্য গুদাম কর্মকর্তার কার্যালয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী গত বোরো সংগ্রহ ২০২৬ এ চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ১২ হাজার ৪৩০ মেট্রিক টন। যার পুরোপুরি অর্জিত হয়। একই মৌসুমে ধানের লক্ষ্যমাত্রা ছিলো ৩ হাজার ৫৫০ মেট্রিক টন। সংগ্রহে অবশিষ্ট ছিলো ১৭৮ মে.টন
এর আগে বোরো সংগ্রহ ২০২৫ এ ধান সংগ্রহে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৩ হাজার ৫৩৭ মে.টন। ক্রয় করা হয়েছে ১১ হাজার ৯০৫ মে.টন। অবশিষ্ট ছিলো ১ হাজার ৬৩২ মে.টন। একই মৌসুমে ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৪৪৫ মে.টন। ধানের লক্ষ্যমাত্রা পুরোপুরি অর্জিত হয়েছে।
বিগত এই দুই অর্থ বছরে ধান ও চাল সংগ্রহের ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
চাল ও চাল সংগ্রহে টনপ্রতি ঘোষ বাণিজ্য, নিম্নমানের চাল সংগ্রহ ও সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ধান ক্রয় করে ইসরাত আহমেদ পাপেল হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েক মিল মালিক ও ম্যানেজার জানান, গুদামে চাল দিতে হলে টনে ৮শ টাকা করে ঘুষ দিতে হয়। নয়তো চালের বিভিন্ন সমস্যা দেখিয়ে ফেরত পাঠিয়ে দেন। বরাদ্দ কমিয়ে দেওয়া সহ বিভিন্ন হুমকি দেন খাদ্য কর্মকর্তা।
এছাড়াও সিংজানি খাদ্য গুদামে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, বিজিডি সহ সরকারের নানা কর্মসূচিতে মালামাল দেওয়ার আগে গুদামের চিহ্নিত লেবার দিয়ে বস্তা থেকে ভুঙ্গা মেরে প্রতি বস্তায় এক থেকে দুই কেজি চাল ও গম বের করে ফেলে।
এই ঘটনার প্রমাণ মিলে গত বছর সিংহজনী খাদ্য গুদাম থেকে ১৫ মেট্রিক টন চাল কালো বাজারে বিক্রি করার সময় গাড়ির চালক সহ র্যাব এর কাছে ধরা পড়লে।
এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আসাদুজ্জামান খান বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন হলেও গাড়ি চালক মুখ না খোলায় কাউকে দায়ী করা যায়নি।
এ ছাড়াও সিংহজানি গুদামে সংগ্রহের সময় লক্ষ লক্ষ পুরাতন এবং শেখ হাসিনার স্লোগান সম্বলিত বস্তা রিসিভ করে যা থেকে ১ লাখ বস্তায় সাত লক্ষ থেকে ৮ লক্ষ টাকা ঘুষ নেই এরকম লক্ষ লক্ষ পুরাতন বস্তা গুদামে রিসিভ করে। প্রতিটি সংগ্রহের সময় নিম্নমানের চাল এবং পুরাতন চাল গুদামে সংগ্রহ করে যা নিয়ে কয়েকবার জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের পরিদর্শনে তা ধরা পরে।
নৈতিক স্খলনের অভিযোগ—-
এসএমও ইসরাত আহমেদ পাপেলের বিরুদ্ধে নৈতিক স্খলনের অভিযোগ রয়েছে। তার নিজ বাড়ি গফরগাঁওয়ের গাজী হাসান বাবু নামে এক অসুস্থ ব্যাক্তির স্ত্রী সাজেদা বেগম ওরফে রুপা খান নামে এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকার সাথে অনৈতিক সম্পর্কের ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
পরে বিষয়টি আমলে নিয়ে আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের নির্দেশে জামালপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।
এ বিষয়ে জামালপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আসাদুজ্জামান খান বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এমন একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা সমালোচনা হলেও কেউ কোন ধরনের অভিযোগ দেয়নি। তাছাড়া বিষয়টি ইসরাত আহমেদের নিজ এলাকার হওয়ায় জামালপুর থেকে কোন প্রমাণ মিলেনি।
রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা—-
ইসরাত আহমেদ পাপেলের গ্রামের বাড়ী ময়মনসিংহ জেলার গফরগাঁও উপজেলার চরআলগি ইউনিয়নে। তার বাবা মফিজ উদ্দিন ছিলেন গফরগাঁও উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ-সভাপতি, সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান। ইশরাত আহমেদ পাপেল আপাদমস্ত একজন আওয়ামী পরিবারের সন্তান। তিনি বর্তমানে আওয়ামী মুক্তিযুদ্ধা সন্তান লীগের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। গফরগাঁওয় উপজেলা আওয়ামী লীগের বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচিতে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের বিভিন্ন ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পাওয়া যায়।
অঢেল সম্পদের মালিক বনে গেছেন—-
২০১০ সালে মুক্তিযোদ্ধা কোঠায় চাকরি পেয়ে মাত্র ১৬ বছরে বনে গেছেন অঢেল সম্পদের মালিক। ব্যাক্তিগত ব্যবহারের জন্য এফ প্রিমিও মডেলের গাড়ি, ময়মনসিংহ শহরের বাউন্ডারি রোড মোড়ে টিউলিপ গার্ডেনে কোটি টাকার ফ্লাট ও গফরগাঁও পৌর শহরে পাঁচতলা বাড়ী সহ গ্রামের বাড়িতে নির্মানাধীন ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে। এছাড়াও করছেন বিলাসবহুল জীবনযাপন।
এতশত অভিযোগের পরও ইসরাত আহমেদ পাপেল বহাল তবিয়তে। চলছেন নিজের মতো করে।
এসকল অভিযোগের বিষয়ে মুঠোফোনে ইসরাত আহমেদ পাপেল বলেন, ‘নারী সংক্রান্ত বিষয়ে যে কথাটি বলা হচ্ছে তা ঠিক নয়। আমি কিছুদিন প্রাইমারী স্কুলে চাকুরী করেছিলাম। সেই সুবাদে ঐ নারীর সাথে পরিচয়। পরবর্তীতে ফুডে চাকুরী হলে মাঝেমধ্যে দেখা হলে কথা হতো। একসময় তার স্বামী অসুস্থ হলে টাকা ধার চাইলে আমি টাকা দেয়। এরপর দুএকবার তাদের বাড়িতে গিয়েছিলাম। তখন ঐ শিক্ষিকার স্বামীর সাথে দেখা হয়। একদিন হঠাৎ তার স্বামী আমাকে তার ফোন করে টাকা দাবি করে। নয়লে তার স্ত্রীর সাথে আমার অনৈতিক সম্পর্ক আছে এমনটি সবাইকে জানাবেন। টাকা না পেয়ে তিনি এমন মিথ্যা খবর ছড়াচ্ছেন।
গাড়ি ও বাসার বিষয়ে বলেন, এগুলো আমার বাবা করে গেছেন। বাবার সম্পদ ছেলে হিসেবে আমি ভোগ করতেই পারি।
অন্যান্য অভিযোগের বিষয়ে ইসরাত আহমেদ পাপেল বলেন, আমাদের খাদ্য বিভাগের একটি পক্ষ আমার নামে মিথ্যাচার করছে।