একদিকে নীল সমুদ্রের অনন্ত ডাক, অন্যদিকে পাহাড় সবুজের মায়াবী হাতছানি যেন প্রকৃতির নিজের হাতে আঁকা এক জীবন্ত ছবি কক্সবাজারকে করেছে দেশের পর্যটনের সবচেয়ে পরিচিত ঠিকানা। সেই নতুন বাস্তবতার বার্তা নিয়েই ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্যে কক্সবাজারে পালিত হয়েছে বিশ্ব পর্যটন দিবস।

সমুদ্রের নীল জলরাশি দীর্ঘ বালুকাবেলা পাহাড় আর প্রকৃতির অপরূপ মেলবন্ধনে কক্সবাজার শুধু বাংলাদেশের পর্যটন রাজধানী নয়, বিশ্ব পর্যটনের মানচিত্রেও সম্ভাবনাময় এক গন্তব্য। প্রতিদিনের সূর্যোদয় সূর্যাস্ত, ঢেউয়ের ছন্দ আর প্রকৃতির টানে দেশ বিদেশের পর্যটকের পদচারণায় মুখর থাকে এই সৈকতনগরী। তবে সময়ের সঙ্গে পর্যটনের ধরন বদলেছে প্রকৃতির সৌন্দর‌্যের পাশাপাশি এখন প্রয়োজন প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা। সেই বাস্তবতায় ‘ডিজিটাল রূপান্তর ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় আগামীর পর্যটন’ প্রতিপাদ্য সামনে রেখে নানা আয়োজনে কক্সবাজারে পালিত হয়েছে বিশ্ব পর্যটন দিবস ২০২৬।

দিবসটি উপলক্ষে রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর) সকালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে শহরের সুগন্ধা পয়েন্ট থেকে বের করা হয় বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। শোভাযাত্রাটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে লাবণী সৈকতের উন্মুক্ত মঞ্চে গিয়ে শেষ হয়। এতে জনপ্রতিনিধি, সরকারি বেসরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষার্থী, পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ অংশ নেন।
পরে লাবণী সৈকতের উন্মুক্ত মঞ্চে অনুষ্ঠিত হয় আলোচনা সভা। এতে সভাপতিত্ব করেন কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান। প্রধান অতিথি ছিলেন কক্সবাজার ৩ আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল। বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামিম আরা বেগম স্বপ্নাসহ পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
‘
পরিকল্পিত উন্নয়নেই বদলাবে পর্যটনের প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, কক্সবাজারের পর্যটনশিল্পকে আরও সমৃদ্ধ, আধুনিক ও আকর্ষণীয় করতে সরকার মাস্টারপ্ল্যান হাতে নিয়েছে। পরিকল্পিত উন্নয়নের মাধ্যমে পর্যটনকেন্দ্রগুলোর অবকাঠামো উন্নয়ন ও পর্যটনসেবার মান বাড়ানোর কাজ চলছে।
তিনি বলেন, কক্সবাজারের পর্যটন শুধু বিনোদনের ক্ষেত্র নয়, এটি দেশের অর্থনীতি, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় মানুষের জীবিকার সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত। পর্যটকদের জন্য নিরাপদ ও মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি স্থানীয় জনগণকে পর্যটন অর্থনীতির সঙ্গে আরও সম্পৃক্ত করতে হবে।‘

সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য শামিম আরা বেগম স্বপ্না বলেন, কক্সবাজারের পর্যটনের বিকাশে সংশ্লিষ্ট সবাইকে আন্তরিকভাবে কাজ করতে হবে। শুধু সরকারি উদ্যোগে পর্যটনশিল্পের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়। পর্যটকদের সঙ্গে ভালো আচরণ, সেবার মান, পরিচ্ছন্নতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা গেলে কক্সবাজারের প্রতি পর্যটকদের আস্থা আরও বাড়বে।

সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. আব্দুল মান্নান বলেন, বর্তমান বিশ্বে পর্যটন দ্রুত প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। কক্সবাজারের পর্যটন ব্যবস্থাপনাকেও সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে এগিয়ে নিতে হবে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার বাড়িয়ে পর্যটকদের তথ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও সেবা ব্যবস্থাকে আরও সহজ ও কার্যকর করার সুযোগ রয়েছে।
তিনি বলেন, কক্সবাজারকে একটি আধুনিক, নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও পর্যটকবান্ধব গন্তব্য হিসেবে গড়ে তুলতে প্রশাসনের পাশাপাশি পর্যটনসংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

আলোচনা সভায় বক্তারা বলেন, কক্সবাজারের পর্যটন সম্ভাবনা বিশাল হলেও সেই সম্ভাবনাকে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগাতে হলে কিছু মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে পর্যটকদের নিরাপত্তা, সৈকতের পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, যানজট নিরসন, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা, পর্যটন অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সেবার মান বৃদ্ধি। পর্যটকের পুরো ভ্রমণ অভিজ্ঞতাকে নিরাপদ, স্বস্তিদায়ক ও স্মরণীয় করে তোলার ব্যবস্থা করতে হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, বিশ্ব পর্যটনের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে কক্সবাজারকে শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর‌্যের ওপর নির্ভর করলে চলবে না। প্রয়োজন ‘স্মার্ট ট্যুরিজম’ ব্যবস্থাপনা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যটকের চাহিদা বিশ্লেষণ, ডিজিটাল তথ্যকেন্দ্র, অনলাইন বুকিং, স্মার্ট নেভিগেশন, বহুভাষিক পর্যটন তথ্য, ভিড় ব্যবস্থাপনা ও জরুরি সেবা আরও কার্যকর করা সম্ভব।