কৈশোরের রঙিন স্বপ্নগুলো যখন অকালেই ঝরে যায় বাল্যবিবাহের নির্মম বাস্তবতায় তখন একটি সমাজের ভবিষ্যৎ অন্ধকারের দিকে ধাবিত হয়। অবোধ শিশুদের সেই ডানা ভাঙার নিষ্ঠুর প্রথা থেকে মুক্ত হয়ে আজ এক নতুন ভোরের আলোয় উদ্ভাসিত হলো কক্সবাজারের খুরুশকুল।
ফুল ফোটারn আগেই ঝরে পড়ার চিরচেনা সেই বিষাদময় চিত্র মুছে ফেলে, শিশুদের সুরক্ষায় এবং তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় আজ এক ঐতিহাসিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ হলো পুরো জনপদ।
এলাকার প্রতিটি শিশুর চোখ ভরা স্বপ্ন আর সুন্দর আগামীর নিশ্চয়তা দিতে ২১ সেপ্টেম্বর, সোমবার খুরুশকুল ইউনিয়ন পরিষদ চত্বর মাঠে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘বাল্যবিবাহ মুক্ত ইউনিয়ন’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ‘ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ’-এর ‘চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্ট’-এর সহযোগিতায় খুরুশকুল ইউনিয়ন পরিষদ এই ব্যতিক্রমী ও দূরদর্শী অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি কক্সবাজার-৩ (সদর-রামু-ঈদগাঁও) আসনের সংসদ সদস্য লুৎফুর রহমান কাজল আনুষ্ঠানিকভাবে এ ঘোষণা দেন। এ উপলক্ষে একটি বিলবোর্ডে লেখা অঙ্গীকারনামায় স্বাক্ষর করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এমপি লুৎফুর রহমান কাজল বলেন, বাল্যবিবাহ রোধে শুধু প্রশাসন কিংবা কোনো একটি প্রতিষ্ঠান কাজ করলে হবে না এলাকার সর্বস্তরের মানুষকে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। সবাই একযোগে কাজ করলে বাল্যবিবাহের প্রবণতা কমিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি অভিভাবকদের উদ্দেশে বলেন, সন্তানদের ভবিষ্যৎ নষ্ট করে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া থেকে তাদের বিরত থাকতে হবে। বয়স লুকিয়ে কিংবা ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে কোনো শিশুর বিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলে তা মেনে নেওয়া হবে না।
এমপি বলেন, জন্মনিবন্ধনে অনিয়ম, জালিয়াতি কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সনদ ব্যবহার করে বয়স পরিবর্তন করে বাল্যবিবাহ দেওয়ার চেষ্টা করেও কেউ পার পাবে না। এ ধরনের অনিয়মের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। বিশেষ করে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে পরিবার, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা, শিক্ষার্থী ও সমাজের সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব রয়েছে। একটি শিশুর বয়স ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগে বিয়ে না দেওয়ার বিষয়ে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন খুরুশকুল ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মো. নাছির উদ্দিন। তিনি বলেন, খুরুশকুল ইউনিয়নকে বাল্যবিবাহমুক্ত রাখার ঘোষণাকে বাস্তবে রূপ দিতে ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে সর্বাত্মক সহযোগিতা করা হবে। কোনো পরিবার যাতে গোপনে বাল্যবিবাহ আয়োজন করতে না পারে, সে বিষয়ে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্টের প্রজেক্ট ম্যানেজার সাগর ডি’কস্তা বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে সামাজিক অংশগ্রহণ ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি ইউনিয়নকে বাল্যবিবাহমুক্ত ঘোষণা করাই শেষ কথা নয় ঘোষণাটিকে টেকসই করতে নিয়মিত নজরদারি, সচেতনতা এবং ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে হবে।
অনুষ্ঠানে ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের মোবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেংদেনিং অফিসার পার্থ প্রতীম বাগচী গত তিন বছরে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিশু সুরক্ষা ও বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া শিশুদের নিয়ে ওয়ার্ল্ড ভিশনের বিভিন্ন কার্যক্রমের সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরেন। একই সঙ্গে আগামী দিনে এসব ক্ষেত্রে আরও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন তিনি।
তিনি বলেন, শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পরিবার ও সমাজকে একই প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার পাশাপাশি ঝরে পড়া শিশুদের পুনরায় শিক্ষায় ফেরানো, অভিভাবকদের সচেতন করা এবং বাল্যবিবাহের ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের চিহ্নিত করে আগেভাগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
এসময় অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্টের অ্যাডভোকেসি কো-অর্ডিনেটর জয়শ্রী পিউরিফিকেশন এবং মোবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেংদেনিং অফিসার লুইজা মন্ডলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, শিক্ষার্থী,সাংবাদিক, অভিভাবক ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
আয়োজকদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের পাশাপাশি শিশু সুরক্ষা, বিদ্যালয় থেকে ঝরে পড়া রোধ এবং শিশুদের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে স্থানীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।
অনুষ্ঠানের শেষ পর্যায়ে উপস্থিত অভিভাবক, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দারা খুরুশকুল ইউনিয়নকে বাল্যবিবাহমুক্ত রাখার অঙ্গীকার করেন। তারা সম্মিলিতভাবে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, শিশুদের শিক্ষা অব্যাহত রাখা এবং কোনো শিশুর বিয়ের আয়োজনের খবর পাওয়া গেলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার বিষয়ে একাত্মতা ঘোষণা করেন।