সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার সীমান্তবর্তী সোনালী চেলা নদীতে রাতের আঁধারে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, নদী রক্ষায় মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচি করেও ড্রেজারের তৎপরতা বন্ধ করা যাচ্ছে না। উল্টো ড্রেজারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে অংশ নেওয়া কয়েকজন স্থানীয় ব্যক্তি পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় আসামি হওয়ায় এলাকায় ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

গত ১৮ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা থেকে ভোর ৪টা পর্যন্ত সরেজমিনে সোনালী চেলা নদীর কয়েকটি এলাকায় ড্রেজারের কার্যক্রম দেখা গেছে বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, চৈলতার ঢালা, পূর্ব সোনাপুরের কলাবাগান ও মরা গাংসহ আশপাশের এলাকায় ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন চলছিল। গভীর রাতে ড্রেজারের শব্দ আশপাশের এলাকাতেও শোনা যায়।

স্থানীয়দের দাবি, কয়েক দিন ধরে রাতের বেলায় এসব এলাকায় বালু উত্তোলন চলছে। নদীতীরের বালু প্রতি ঘনফুট প্রায় ২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে বলেও তারা জানান। তবে কত পরিমাণ বালু উত্তোলন করা হয়েছে কিংবা এর আর্থিক মূল্য কত—এ বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো সরকারি হিসাব পাওয়া যায়নি। ফলে ‘৫০ কোটি টাকার বালু লুট’ দাবিটিকে নিশ্চিত তথ্য হিসেবে উপস্থাপন করা যাচ্ছে না।

ইজারার বাইরে বালু তোলার অভিযোগ

সোনালী চেলা নদীর ইজারাদার শাহ রুবেল দাবি করেন, তাঁর ইজারাকৃত এলাকার বাইরে স্থানীয় কিছু ব্যক্তি রাতের আঁধারে ড্রেজার চালিয়ে বালু উত্তোলন করছেন। বিষয়টি জানিয়ে তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন বলেও জানান।

শাহ রুবেলের দাবি, বালু উত্তোলনের সঙ্গে তাঁর কোনো স্টাফ বা লোকজন জড়িত নন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও বিষয়টি অবগত রয়েছে।

তবে ইজারাকৃত এলাকায় বিভিন্ন উৎস থেকে আসা বালুবাহী নৌকা থেকে রয়্যালটি আদায়ের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, বিভিন্ন স্থান থেকে বালু আসায় সব সময় কোনটি নদী থেকে উত্তোলন করা এবং কোনটি ড্রেজারের মাধ্যমে তোলা—তা আলাদা করে শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রহমতপুর, সোনাপুর, আলমপুর, ছনবাড়ি ও কলাবাগানসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে। তবে এসব ড্রেজারের কোনটির বৈধ অনুমোদন রয়েছে, কোনটি ইজারাকৃত এলাকার মধ্যে এবং কোনটি ইজারার বাইরে—তা সরকারি নথি ও ইজারার সীমানা যাচাই ছাড়া নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মামলায় ২৬ জন

সোনালী চেলা নদীর শাখা চৈলতার ঢালা এলাকায় নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের অভিযোগে গত ২১ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তর ২৬ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। একই মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও ১০ জনকে আসামি করা হয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের সুনামগঞ্জ কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. মোহাইমিনুল হক বাদী হয়ে ছাতক থানায় মামলাটি করেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের ভাষ্য অনুযায়ী, ৬ থেকে ১৬ জুলাইয়ের মধ্যে কর্মকর্তারা একাধিকবার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন। তাদের দাবি, রাতের বেলায় নদীর পাড় কেটে বালু উত্তোলনের তথ্য পাওয়ার পর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়। মামলায় বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ (সংশোধিত ২০১০)-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।

তবে মামলার আসামিদের কয়েকজনের দাবি, তারা বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িত নন; বরং নদী রক্ষার দাবিতে আয়োজিত মানববন্ধন ও প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর তাদের নাম মামলায় এসেছে।

কোণিমোড়া বাজারের ব্যবসায়ী রোয়াব আলী বলেন, ড্রেজারের বিরুদ্ধে কয়েকটি প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পর তিনি মামলার আসামি হয়েছেন। মামলার অভিযোগের সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি।

সোনাপুরের ধন মিয়া মেম্বার, কৃষক আরজু মিয়া, বারকি শ্রমিক মাফিজ আলী, ইলিয়াছ আলী, ছাতকের রয়্যালটি ঘাটের শ্রমিক রমজান আলী, আলমপুরের নজির আলী এবং ইসলামপুর ইউনিয়নের আব্দুল খালেকও একই ধরনের দাবি করেছেন। তাঁদের ভাষ্য, নদী রক্ষার আন্দোলনে অংশ নেওয়ার কারণেই তাঁদের মামলায় আসামি করা হয়েছে।

তবে এসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলায় সুনির্দিষ্ট কী অভিযোগ আনা হয়েছে, তারা আদৌ বালু উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন কি না এবং প্রতিবাদ কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার কারণেই তাদের আসামি করা হয়েছে কি না—এসব বিষয়ে মামলার নথি ও তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ।

ড্রেজার জব্দের নজিরও রয়েছে

সোনালী চেলা নদীতে অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগ নতুন নয়। গত আগস্টে বিভিন্ন প্রতিবেদনে নদীর বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজারের বিরুদ্ধে স্থানীয়দের প্রতিবাদ এবং প্রশাসনিক অভিযানের তথ্য প্রকাশিত হয়। ৩ আগস্টের এক অভিযানে ২১টি এবং আরেক অভিযানে ২২টি ড্রেজার ও সংশ্লিষ্ট নৌযান জব্দের তথ্য স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছিল।

এ ছাড়া ৬ আগস্ট স্থানীয় বাসিন্দারা সোনাপুর, কলাবাগান, কাজিরগাঁও, আলমপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় ড্রেজারের মাধ্যমে বালু উত্তোলনের অভিযোগ তুলে প্রতিবাদ সভা করেন এবং তা বন্ধে প্রতিরোধের ঘোষণা দেন।

ফলে বর্তমান অভিযোগকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনার বদলে দীর্ঘদিনের বালু উত্তোলন-বিরোধী স্থানীয় বিরোধের ধারাবাহিকতার মধ্যেও দেখা হচ্ছে। তবে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের সঙ্গে কারা সরাসরি জড়িত এবং এর পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ চক্র রয়েছে কি না, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রাখার দাবি

অবৈধ বালু উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়ে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল বলেন, অবৈধভাবে বালু উত্তোলন বন্ধে জেলা প্রশাসন সচেষ্ট রয়েছে। দোয়ারাবাজারে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিক মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হয়েছে। টাস্কফোর্সের অভিযানও হয়েছে এবং এসব অভিযানে কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড ও নৌযান জব্দ করা হয়েছে।

তিনি বলেন, স্থানীয় বিজিবি, পুলিশ ও উপজেলা প্রশাসনকে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার জন্য বলা হয়েছে। নদী ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় অভিযান অব্যাহত থাকবে এবং প্রয়োজন হলে আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সোনালী চেলায় রাতের বেলায় ড্রেজার চলার অভিযোগ, ইজারাকৃত এলাকার বাইরে বালু উত্তোলন এবং নদী রক্ষার আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা—এই তিনটি বিষয় এখন স্থানীয়ভাবে আলোচনায় রয়েছে। অভিযোগগুলোর প্রকৃত চিত্র নির্ধারণে ড্রেজারগুলোর অনুমোদন, ইজারার সীমানা, পরিবেশগত ছাড়পত্র, মামলার এজাহার এবং প্রশাসনের অভিযানসংক্রান্ত নথি পর্যালোচনা প্রয়োজন।