নোয়াখালী সদর উপজেলার ৫ নম্বর বিনোদপুর ইউনিয়নের পূর্ব বিনোদপুর হামিদ মিঞা জামে মসজিদ ওয়াকফ এস্টেট (ইসি নং-২১৯০১) নিয়ে মোতাওয়াল্লী পদ দখল, ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা এবং আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় এস্টেটের অফিসিয়াল মোতাওয়াল্লী মো. নোমান প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দিয়ে প্রতিকার ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
অভিযোগপত্র ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৯ সালের ২৯ ডিসেম্বর ২৬৩০ নম্বর রেজিস্ট্রি দলিলের মাধ্যমে ওয়াকিফা বদরের নেছা সাহেবানী তাঁর স্বামীর বাড়ির দরজায় অবস্থিত হামিদ মিঞা জামে মসজিদ ও তৎসংলগ্ন ৭৬ শতাংশ জমি ওয়াকফ করেন। দলিলে নির্ধারিত ব্যবস্থার ধারাবাহিকতায় তাঁর স্বামী ফজলুর রহমান ভূঞা এবং পরে তাঁদের ছোট মেয়ে আছিয়া খাতুন মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব পালন করেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়, আছিয়া খাতুনের মৃত্যুর পর তাঁর একমাত্র নাবালক ছেলে আবু বকর ছিদ্দিক ওয়াকফ সম্পত্তির দেখাশোনা করেন। পরবর্তীতে তিনি সাবালক হয়ে মোতাওয়াল্লীর দায়িত্ব পালনকালে স্থানীয় দানশীল ব্যক্তিদের মৌখিকভাবে দেওয়া আরও ৯ শতাংশ জমিসহ মোট ৮৫ শতাংশ জমি বিএস খতিয়ানে ওয়াকফ এস্টেট হিসেবে রেকর্ডভুক্ত করেন বলে দাবি করা হয়েছে।
পরবর্তী সময়ে আবু বকর ছিদ্দিক গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁর জ্যেষ্ঠ ছেলে মো. নোমান ওয়াকফ অধ্যাদেশ, ১৯৬২-এর ৬৭ ধারার আওতায় ওয়াকফ এস্টেট তালিকাভুক্ত করার জন্য আবেদন করেন। অভিযোগ অনুযায়ী, জেলা প্রশাসন ও নোয়াখালীর ওয়াকফ হিসাব নিরীক্ষকের যৌথ তদন্ত ও শুনানির পর ২০১৩ সালের ১৩ জুন নোমানকে দুই বছরের জন্য অফিসিয়াল মোতাওয়াল্লী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়।
নোমানের অভিযোগ, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার পর আবু ওফা ইয়াহিয়া (সাজু) ও তাঁর সহযোগীরা ওয়াকফ এস্টেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করেন। এ নিয়ে বিভিন্ন দপ্তরে আবেদন এবং আদালতে মামলাও করা হয় বলে তিনি দাবি করেছেন।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, মসজিদ পুনর্নির্মাণের নামে সংগৃহীত অর্থ, দোকানভাড়া, মৎস্য খামার এবং বিভিন্ন দান-অনুদানের অর্থ ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম হয়েছে এবং বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রাখা, ওয়াকফ সম্পত্তি দীর্ঘমেয়াদি বন্ধক দেওয়ার চেষ্টা এবং অফিসিয়াল মোতাওয়াল্লীকে দায়িত্ব পালনে বাধা দেওয়ার অভিযোগও করা হয়েছে।
তবে এসব আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের স্বাধীন প্রমাণ বা সংশ্লিষ্ট কমিটির বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে নথিপত্র ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্ত প্রয়োজন।
নোমানের দাবি, তাঁর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আবু ওফা ইয়াহিয়া (সাজু) ওয়াকফ প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে আবেদন করেন এবং দেওয়ানি আদালতেও মামলা করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এসব আবেদনের কয়েকটি পরবর্তী সময়ে খারিজ হয় এবং তাঁর মোতাওয়াল্লী হিসেবে বৈধতা বহাল থাকে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, পরবর্তীতে ‘বদরন নেছা চৌধুরানী ওয়াকফ এস্টেট’ নামে ইসি নং-১৪৯৩১-এর আরেকটি এস্টেটের মাধ্যমে একই সম্পত্তির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে। এ দাবির বিষয়েও সংশ্লিষ্ট ওয়াকফ কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও নথিপত্র যাচাই করা প্রয়োজন।
এদিকে, আবু ওফা ইয়াহিয়া (সাজু) ওয়াকফ প্রশাসনের অতিরিক্ত সচিব, উপ-ওয়াকফ প্রশাসক, ওয়াকফ প্রশাসক, জেলা প্রশাসক ও জেলা ওয়াকফ উন্নয়ন কমিটির সভাপতিসহ মো. নোমানকে বিবাদী করে নোয়াখালীর সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে ৮৮/২০১৯ নম্বর মামলা দায়ের করেছিলেন বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই মামলা আদালত খারিজ করে দেন বলেও দাবি করা হয়েছে। তবে মামলার রায় বা আদেশের প্রত্যয়িত কপি হাতে না থাকায় এর বিস্তারিত কারণ ও আদালতের পর্যবেক্ষণ নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।
ওয়াকফ এস্টেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দীর্ঘদিনের বিরোধে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগকারীর পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। মসজিদ ও ওয়াকফ সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের কারণে এলাকায় সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা জানিয়েছেন।
অফিসিয়াল মোতাওয়াল্লী মো. নোমান বলেন, ওয়াকফ সম্পত্তি রক্ষা, মসজিদের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখা এবং সম্পত্তির আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। তিনি ওয়াকফ এস্টেটের নথিপত্র যাচাই করে প্রকৃত অবস্থা নির্ধারণ এবং বেআইনি দখল বা আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
স্থানীয় বাসিন্দারাও বিরোধের শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং মসজিদ ও ওয়াকফ সম্পত্তির স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।