চুয়াডাঙ্গার চার উপজেলায় ৪৫টি সার ডিলারশিপের বিপরীতে ৬৪৩টি আবেদন জমা পড়েছে। ফলে প্রতি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে প্রায় ১৪ জন আবেদনকারী রয়েছেন। আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ জেলা, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী বলে স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। তবে আবেদনকারীদের রাজনৈতিক পরিচয় যাচাই করে কোনো সরকারি তালিকা প্রকাশ করা হয়নি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলায় ১১টি ডিলারশিপের বিপরীতে ১৭৪টি আবেদন জমা পড়েছে। আলমডাঙ্গায় ১৬টি ডিলারশিপের জন্য আবেদন করেছেন ১৯৮ জন। দামুড়হুদায় ৯টি ডিলারশিপের বিপরীতে ১৬০টি এবং জীবননগরে ৯টি ডিলারশিপের জন্য ১১১টি আবেদন জমা পড়েছে। এসব সংখ্যা মোট ৪৫টি ডিলারশিপের বিপরীতে ৬৪৩টি আবেদনের সঙ্গে মিলে যায়।
কৃষি মন্ত্রণালয় গত ৩০ আগস্ট ২০২৬ সালে ‘সার ডিলার নিয়োগ ও সার বিতরণ সংক্রান্ত সমন্বিত নীতিমালা-২০২৬’ বাস্তবায়নের নোটিশ প্রকাশ করেছে।
যেভাবে হবে বাছাই
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, আবেদনগুলো প্রথমে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি যাচাই-বাছাই করবে। এরপর নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় উপজেলা পর্যায়ে তথ্য যাচাই করে যোগ্য প্রার্থীদের প্রস্তাব করা হবে। পরবর্তী ধাপে জেলা কমিটি প্রস্তাবিত প্রার্থীদের তথ্য পুনরায় যাচাই করে কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠাবে এবং চূড়ান্ত মনোনয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নূরল ইসলাম বলেন, “৪৫টি ডিলারশিপের বিপরীতে ৬৪৩টি আবেদন জমা পড়েছে। কোনো বিবেচনায় নয়, ২০২৬ সালের নীতিমালার আলোকে যোগ্য প্রার্থীরাই ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাবেন।”
কৃষি মন্ত্রণালয়ের সরকারি নীতিমালা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি তথ্য অনুযায়ী, সার ডিলার নিয়োগের জন্য নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার কথা রয়েছে।
রাজনৈতিক পরিচয়ের আবেদনকারীদের নিয়ে আলোচনা
এদিকে স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে দেখা গেছে, আবেদনকারীদের মধ্যে বিএনপির জেলা, উপজেলা, পৌর, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ের কিছু নেতা-কর্মীর নাম রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা কয়েকজনের মধ্যে রয়েছেন চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. নজরুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মনিরুজ্জামান লিপ্টন, জেলা যুবদলের সভাপতি শরিফুজ্জামান সিজার, জেলা ছাত্রদলের সভাপতি শাহাজাহান, দামুড়হুদা উপজেলা বিএনপির সভাপতি রফিকুল হাসান তনু, দর্শনা থানা বিএনপির সভাপতি খাজা আবুল হাসনাত এবং জীবননগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান খোকনসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।
তবে এসব নামের প্রত্যেকের আবেদন ও রাজনৈতিক পদমর্যাদা সরকারি নথির মাধ্যমে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে আবেদনকারীদের রাজনৈতিক পরিচয়সংক্রান্ত তথ্যকে সংশ্লিষ্ট সূত্র ও ব্যক্তিদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিবেচনা করা হচ্ছে।
জীবননগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেন খান খোকন বলেন, “আমাদের দলের প্রায় সব নেতাই আবেদন করেছে। আমিও করেছি। সার ডিলার নিয়ে যে অবস্থা মনে হচ্ছে, দেখি পাই কি না।”
চুয়াডাঙ্গা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালকের কার্যালয়ের অফিস সহকারী রফিকুল ইসলাম বলেন, প্রচুর আবেদন জমা পড়েছে। আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই চলছে।
কৃষকের স্বার্থে স্বচ্ছ নিয়োগের দাবি
স্থানীয় কৃষক ও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরিবর্তে নির্ধারিত যোগ্যতা, অবকাঠামো, আর্থিক সক্ষমতা, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং সার সরবরাহ ও বাজারজাতকরণের সক্ষমতাকে গুরুত্ব দেওয়া হবে।
সার ডিলারশিপ কৃষকদের কাছে ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি, এমওপি ও অন্যান্য সার সরবরাহের ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। ফলে ডিলার নিয়োগ ও বিতরণ ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা এবং নিয়মিত সরবরাহ কৃষকের সময়মতো সার পাওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
চুয়াডাঙ্গা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক লুৎফন নাহার বলেন, “সকল নিয়ম, নীতিমালা মেনে সার ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে।”
উল্লেখ্য, গত ১ সেপ্টেম্বর চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন। ১০ সেপ্টেম্বর ছিল আবেদনের শেষ দিন। ৪৫টি ডিলারশিপের বিপরীতে ৬৪৩টি আবেদনের তথ্য পরবর্তী সময়ে একাধিক সংবাদমাধ্যমেও প্রকাশিত হয়েছে।