ময়মনসিংহের ফুলবাড়ীয়া উপজেলার আছিম বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষক আব্দুর রেজ্জাক দুলালকে পুনরায় বিদ্যালয়ে ফেরানোর চেষ্টা চলছে—এমন খবর ছড়িয়ে পড়ায় শিক্ষক-কর্মচারী, শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত চলমান থাকায় তাঁকে বিদ্যালয়ে ফেরানো হলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন কয়েকজন শিক্ষক ও স্থানীয় বাসিন্দা।

বিদ্যালয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক আব্দুর রেজ্জাক দুলালের বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন আর্থিক কার্যক্রমে প্রায় ১ কোটি ৫৯ লাখ টাকা অনিয়ম ও আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিনি বর্তমানে সাময়িক বরখাস্ত রয়েছেন এবং অভিযোগগুলো যাচাইয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলছে।

স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, তদন্ত শেষ হওয়ার আগে তাঁকে বিদ্যালয়ে পুনরায় প্রবেশ বা দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেওয়া হলে বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বিঘ্নিত হতে পারে। তবে তাঁকে বিদ্যালয়ে ফেরানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে—এমন দাবির বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো সিদ্ধান্তের তথ্য পাওয়া যায়নি।

বিদ্যালয়ের শিক্ষক-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রধান শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম তুলনামূলক স্বাভাবিক রয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন। তাঁদের দাবি, বর্তমানে শিক্ষক-কর্মচারীরা নিয়মিত তাঁদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন এবং বিদ্যালয়ের কার্যক্রমও স্বাভাবিকভাবে চলছে।

বিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিষয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ মোরশেদ আলম বলেন, “অভিযোগের কারণে সাময়িক বরখাস্ত হওয়া প্রধান শিক্ষককে পুনরায় বিদ্যালয়ে আনার বিষয়ে আমরা উদ্বিগ্ন। বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখতে বিষয়টি কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমাধান হওয়া প্রয়োজন। আগে আমরা অনেক কিছুই পেতাম না। বর্তমানে আমরা আমাদের ন্যায্য প্রাপ্য নিয়মিত পাচ্ছি।”

গণিত বিষয়ের সহকারী শিক্ষক সাত্তার মাহমুদ বলেন, “প্রধান শিক্ষক সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে বিদ্যালয়ের শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসীর মধ্যে স্বস্তি রয়েছে। আমরা চাই অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত হোক এবং তদন্তে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক। বর্তমানে আমরা আমাদের ন্যায্য প্রাপ্য নিয়মিত পাচ্ছি।”

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক বলেন, তদন্তাধীন অবস্থায় প্রধান শিক্ষককে বিদ্যালয়ে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হলে শিক্ষক-কর্মচারী ও এলাকাবাসীর মধ্যে উত্তেজনা তৈরি হতে পারে। তাঁরা কোনো ধরনের সংঘাত চান না। পরিস্থিতি বিবেচনায় প্রশাসনের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে তাঁরা মনে করেন।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, প্রধান শিক্ষক দায়িত্বে থাকাকালে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং তাঁদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে বিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিষয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টার অভিযোগও করেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি এবং সংশ্লিষ্ট তদন্তে বিষয়গুলো যাচাইয়ের বিষয়।

প্রধান শিক্ষক আব্দুর রেজ্জাক দুলাল উপজেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ফুলবাড়ীয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মোস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, “প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। বিষয়টি তদন্তের মাধ্যমে যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তদন্ত কমিটি প্রয়োজন মনে করলে বিদ্যালয়ে আসতে পারে। এটি কর্তৃপক্ষের বিষয়।”

বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নুরুন্নাহার বলেন, “তদন্তকারী কর্মকর্তারা রিপোর্ট যথাস্থানে পৌঁছে দেবেন। আমার হাতে এখনো কোনো প্রতিবেদন আসেনি।”

এদিকে শিক্ষক-কর্মচারীদের দাবি, আর্থিক অনিয়মের অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ তদন্ত শেষ করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হোক। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বিদ্যালয়ে যাতে কোনো ধরনের উত্তেজনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি না হয়, সে জন্য প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোরও দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

তাঁদের মতে, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কোনো ব্যক্তিগত বা রাজনৈতিক বিরোধের কারণে যাতে শিক্ষার্থী ও শিক্ষক-কর্মচারীরা ক্ষতিগ্রস্ত না হন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সতর্ক থাকতে হবে।

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সাময়িক বরখাস্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুর রেজ্জাক দুলালের সঙ্গে একাধিকবার মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।