কক্সবাজারকে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি প্রশাসন, পুলিশ, উন্নয়ন সংস্থা, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সমন্বিত উদ্যোগ অপরিহার্য বলে মত দিয়েছেন জেলার পুলিশ কর্মকর্তারা ও শিশু সুরক্ষাবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে বিদ্যমান আইন যথাযথভাবে প্রয়োগের পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে নজরদারি জোরদার এবং ঝুঁকিপূর্ণ শিশুদের সুরক্ষা বলয়ের আওতায় আনার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে সভায়।
রোববার (২৩ আগস্ট) সকাল ১১টায় কক্সবাজার পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সম্মেলন কক্ষে “শিশু সুরক্ষা নিশ্চিতকরণে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম মুক্ত কক্সবাজার জেলা গঠন” শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্ট এ গোলটেবিল আলোচনার আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে সাবলীল সঞ্চালনা ও শুভেচ্ছা বক্তব্য দেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের চাইল্ড সেফটি নেট প্রজেক্ট ম্যানেজার সাগর ডি কস্তা। তিনি বলেন, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্র, পরিবার ও সমাজের সম্মিলিত দায়বদ্ধতা। বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম শিশুর শৈশব, শিক্ষা, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনাকে সংকুচিত করে। তাই প্রতিরোধমূলক কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করে ঝুঁকিপূর্ণ শিশু ও পরিবারকে আগাম শনাক্ত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, মাঠপর্যায়ে শিশু সুরক্ষা কাঠামোকে শক্তিশালী করার পাশাপাশি আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে উন্নয়ন সংস্থাগুলোর কার্যকর সমন্বয় থাকলে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে দৃশ্যমান পরিবর্তন আনা সম্ভব।
অনুষ্ঠানে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে শিশু সুরক্ষা আইন বিষয়ে প্রজেক্টরের মাধ্যমে বিস্তারিত উপস্থাপন করেন মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। তিনি আইনগত বিধান, অপরাধের ধরন, প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ে আইন প্রয়োগের বাস্তবতা তুলে ধরেন। পাশাপাশি অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন তিনি।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের সিনিয়র ম্যানেজার রোনাল্ড প্রবীর চিসিক শুভেচ্ছা বক্তব্যে বলেন, শিশু সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হলে শুধু ঘটনা ঘটার পর প্রতিক্রিয়া দেখালে চলবে না; বরং ঝুঁকি সৃষ্টির আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের পেছনে থাকা দারিদ্র্য, সামাজিক কুসংস্কার, অসচেতনতা ও পারিবারিক চাপ মোকাবিলায় সমন্বিত সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন।
অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি কক্সবাজারের পুলিশ সুপার এ.এন.এম. সাজেদুর রহমান বলেন, বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে পুলিশের অবস্থান হবে কঠোর এবং দায়িত্বশীল। শিশুদের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের শৈথিল্য গ্রহণযোগ্য নয়। কক্সবাজারকে বাল্যবিবাহমুক্ত করার লক্ষ্যে পুলিশ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতিতে কাজ করবে।
তিনি বলেন, শুধু আইন প্রয়োগ করে বাল্যবিবাহ বন্ধ করা সম্ভব নয়। কোনো এলাকায় বাল্যবিবাহের ঝুঁকি তৈরি হলে স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, শিক্ষক, ধর্মীয় নেতা, পরিবার, কমিউনিটি প্রতিনিধি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। একইভাবে শিশুশ্রমের পেছনে থাকা সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণগুলো চিহ্নিত করে বিকল্প সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।
পুলিশ সুপার আরও বলেন,একটি শিশুর বিয়ে বন্ধ করাই শেষ কথা নয়; তাকে নিরাপদ পরিবেশে রেখে শিক্ষা ও বিকাশের সুযোগ নিশ্চিত করাও আমাদের দায়িত্ব। এ জন্য জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পুলিশের ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণ, তথ্য আদান—প্রদান এবং সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
অনুষ্ঠানে বক্তারা বলেন, কক্সবাজারের মতো পর্যটন নির্ভর ও বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর জেলায় শিশুশ্রম ও বাল্যবিবাহ প্রতিরোধে উপজেলা ও ইউনিয়নভিত্তিক ঝুঁকি চিহ্নিতকরণ, নিয়মিত নজরদারি, দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা কার্যক্রমকে একই সূত্রে আনতে হবে। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা, শিক্ষায় পুনঃসম্পৃক্ততা ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গোলটেবিল আলোচনায় জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে পুলিশের প্রায় ৪০ জন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা অংশ নেন। তাঁরা নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে বিদ্যমান বাস্তবতা, চ্যালেঞ্জ এবং সম্ভাব্য করণীয় নিয়ে মতামত দেন।
উপস্থিত ছিলেন, ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের মোবিলাইজেশন অ্যান্ড সিস্টেম স্ট্রেংদেনিং অফিসার পার্থ প্রতীম বাগচী ,চাইল্ড প্রটেকশন, এডুকেশন অ্যান্ড জিইএস কোঅর্ডিনেটর শাহানাজ পারভীন,ও সাংবাদিকবৃন্দ।
অনুষ্ঠানে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রম প্রতিরোধে পুলিশের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণ, মাঠপর্যায়ে সমন্বয় জোরদার এবং শিশু সুরক্ষায় কার্যকর অংশীদারত্ব তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা কক্সবাজারকে বাল্যবিবাহ ও শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স জেলা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।